স্বপ্নপুরী লাক্ষাদ্বীপ

(২য় পর্ব)-তিননাকারা
 লাক্ষাদ্বীপ মানে লক্ষ দ্বীপের সমাবেশ।এখানে দিনগুলো অলসভাবে নানা রঙে রঙিন হয়ে একটু একটু করে গুটি গুটি পা ফেলে এগোতে থাকে,রাতের উজ্জ্বল আকাশে চাঁদ তারারা আপনমনে ঘোরাফেরা করে আর নির্জন শুভ্র বালুতটে মিষ্টি শব্দে সমুদ্রের রুপালি ঢেউ আছড়ে পড়ে।
      বহ উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা, চিন্তা ভাবনা, আনন্দকে সঙ্গী করে আমাদের  স্বপ্নের সফর লাক্ষাদ্বীপ এর যাত্রা শুরু হলো 8th ফেব্রুয়ারি।রাত 9টায় কলকাতা থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে চড়ে বারোটার মধ্যে ব্যাঙ্গালোর পৌঁছে গেলাম।সারারাত এয়ারপোর্ট এ কাটিয়ে পরদিন সকাল 7টার এয়ার ইন্ডিয়ার উড়ানে চেপে বেলা10টায় পৌঁছে গেলাম লাক্ষাদ্বীপের একমাত্র ছোট্ট এয়ারপোর্ট আগাতিতে।






     ব্যাঙ্গালোর থেকে কোচি হয়ে ওড়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই আরব সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর দিয়ে উড়তে লাগল আমাদের বিমান।ছোট্ট জানলা দিয়ে অপার  বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম।আকাশের সাদা মেঘ আর সাগরের নীলাভ জলরাশি তখন মিলেমিশে একাকার।এর মধ্যেই সমুদ্রের মাঝে একটুকরো স্থলভূমির দেখা মিলল।কি অসীম নৈপুণ্যতায় পাইলট প্লেনটাকে ল্যান্ড করালেন সরু ফিতের মত একফালি ছোট্ট রানওয়েতে।চতুর্দিক তখন নীলিমায় নীল,ঘোর কাটছেই না।বিমানসেবিকার ডাকে চমক ভাঙলো।উড়ান থেকে নামতেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।





      সমুদ্র এত রঙিন হতে পারে? হাল্কা নীল,ঘন নীল, আকাশ নীল, তুঁতে নীল,মরকত নীল, নৌ নীল, ময়ূরকন্ঠী নীল, তুঁতে সবুজ, পান্না সবুজ...প্রকৃতির কি মোহময়ী রূপ? চোখের পলক পড়ছে না, সবাই মোহাচ্ছন্ন, অভিভূত।
      যদিও বলা হয় লক্ষদ্বীপের সমষ্টি কিন্ত ওখানে36টা দ্বীপ আছে আর তার মধ্যে 10 টায় বসতি আছে।এখানের সব কটি দ্বীপই 'লেগুন'পরিবেষ্টিত।সেজন্য বড় জাহাজ দ্বীপে ভিড়তে পারে না, ছোট বোটে করে যেতে হয়।ঢেউবিহীন এই লেগুনের জল একদম ক্রিস্টাল ক্লিয়ার, পান্না সবুজ রঙে রাঙানো।এখানকার মানুষজন অত্যন্ত সরল,সৎ ও অতিথিপরায়ণ।জীবনযাত্রা খুব সাধারণ মানের।




    আগাতি আইল্যান্ড লম্বায়7.6কিমি,পপুলেশন সাত হাজার সাতশোর মত।গুটিকয়েক ঘর নিয়ে ছোট্ট এয়ারপোর্ট আগাতির অফিস।সেখানে আমাদের পারমিট ও সচিত্র পরিচয়পত্র চেক করা হলো।বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছিল।লাগেজ নিয়ে গাড়িতে উঠে চললাম আগাতির ফেরিঘাটের দিকে।গ্রামের রাস্তা ধরে নারকেল বনের মাঝ দিয়ে গাড়ি ছুটে চললো।দুপাশে রঙিন সমুদ্র, গাছের ফাঁক দিয়ে অনাবিল সৌন্দর্যের হাতছানি আর তার সাথে মন প্রাণ জুড়ানো ঠান্ডা হাওয়া।
     ফেরিঘাটে স্পীড বোট অপেক্ষা করছিল তাতে চেপে চললাম তিননাকারার দিকে।কিন্তু বোটে উঠে জানা গেল আমরা প্রথমে যাব বাঙ্গারাম,সেখান থেকে লাঞ্চ করে তিননাকারায় নিয়ে যাওয়া হবে।অসীম সমুদ্রের নীলাভ জলরাশির মধ্যে দিয়ে ভেসে চললো আমাদের বোট।চতুর্দিকে নানা রঙে রঙিন  আদিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি,উড়ুক্কু মাছেদের লাফালাফি দেখতে দেখতে কখন যে একঘন্টা পার হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না।পৌঁছে গেলাম বাঙ্গারাম।পেটে তখন ছুঁচোয় ডন মারছে।ডাইনিং হলে গিয়ে দেখি এলাহি বাফের আয়োজন। ভাত, রুটি,ডাল(দু রকম),সবজি(তিন রকম),মাশরুম, ফিস, চিকেন, পাঁপড়, পায়েস, সাথে ফালি করে কাটা তরমুজ..কত রকমারি খাবার কি বলব?মনে হলো না কোন প্রত্যন্ত দ্বীপে লাঞ্চ করছি।পেটপুরে খেয়ে নিয়ে চললাম তিননাকারায়।




    বাঙ্গারামের ঠিক বিপরীত দিকে অধিবাসীহীন এক অনিন্দ্য সুন্দর পরিচ্ছন্ন দ্বীপ তিননাকারা।মিনিট কুড়ি বোটে চলার পর চোখের সামনে ভেসে উঠলো মরকত নীল জলের মধ্যে স্বচ্ছ সাদা বালির দ্বীপ তিননাকারা।ছিপছিপে তন্বী রূপসী তিননাকারা তার রূপের ছটায় আমাদের মোহিত করে দিল।প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেলাম। রিসোর্টের কর্মীদের উষ্ণ অভ্যর্থনায়  সারারাতের ক্লান্তি এক নিমেষে  দূর হয়ে গেল।ছোট্ট 2.3কিমি চৌহদ্দির এই দ্বীপে পৌঁছে মনে হচ্ছিল যেন কোন রূপকথার স্বর্গরাজ্যে ঢুকে পড়েছি।
     নারকেল গাছের ছায়ায় ঘেরা খড়ের চালের কটেজ গুলো খুব সুন্দর।সবাই ফ্রেশ হয়ে নিয়ে একটু বিশ্রামের পর  বেরোলাম দ্বীপটা ঘুরে দেখতে।তখনই সূর্যদেব পশ্চিম আকাশে ঢলতে শুরু করেছেন।অস্তগামী সূর্যের কমলা আলোয় সাদা বালিতে তখন রঙের অপূর্ব আলপনা।কি মনোমুগ্ধকর সে দৃশ্য তা ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য আমার নেই।চোখ ভরে দেখলাম আর আশ মিটিয়ে ছবি তুললাম।কিন্ত মন ক্যামেরায় যে ছবি আঁকা হয়ে গেল তা সারাজীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে রইল।আরব সাগরের বুকে এক অতুলনীয় সূর্যাস্তের সাক্ষী হয়ে রইলাম আমরা।
     তিননাকারায় কাটিয়েছিলাম মাঘী পূর্ণিমার রাত।ঝকঝকে নীল আকাশে থালার মত চাঁদ তার রূপের ডালি উজাড় করে দিয়েছে, নক্ষত্ররা আপন ছন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে,  রুপোলি আলোর স্পর্শে সমুদ্রের বুকে হীরের দ্যুতি  ঠিকরে বেরোচ্ছে। এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ।সেই ঝিম ধরানো জোস্নারাতে বিচের ওপর বসে ক্যান্ডেল লাইট বাফে ডিনার সারলাম।
      কিন্তু ঘরে যেতে মন চায় না,কিসের এক অমোঘ টানে চললাম সমুদ্রতীরে।রাত ক্রমশঃ গভীর হচ্ছে, নিঝুম দ্বীপে ঘুম নেমে আসছে।আমরা কজন সমুদ্রের পাড়ে বসে সেই নিস্তব্ধ সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করে চলেছি।চারিপাশ রুপোলি আলোয় ভেসে যাচ্ছে, জলপরীরা জল থেকে উঠে জ্যোৎস্নালোকে  স্নান করে জলকেলি করছে।এক রঙিন রূপকথার জাল বুনতে বুনতে অপার্থিব স্বর্গসুখ অনুভব করতে লাগলাম।দূরে সমুদ্রের বুকে টুপ করে তারা খসে পড়ল,চাঁদ এখানে দুরদ্বীপবাসীনি নয়,একদম আমাদের নাগালের মধ্যে, এখানে কি নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়? সবাই ঘুমের দেশে, কেবল জেগে আমরা কজন জানিনা কিসের অপেক্ষায় প্রহর গুনছি?রুপালি চাঁদ, নীলাভ জল আর ঢেউয়ের সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়েছি আমরা, অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে,জনমানবহীন নিশুতি দ্বীপ,মিষ্টি সুরে ঢেউয়ের আওয়াজ,কিসের এক নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছি আমরা...এমন জ্যোৎস্নাময় মায়াবী রাত  জীবনে কখনো আসেনি।কেবলই মনে হচ্ছিল
'এমন দৃশ্য কখনো দেখিনি আমি
মাটিতে যে আজ স্বর্গ এসেছে নামি'।
     পরদিন সেই চাঁদজড়ানো মিষ্টি ভোরে ঘুম ভাঙলো ছটায়।কটেজ থেকে বের হতেই দেখলাম সাদা বালুপ্রান্তর ভেসে যাচ্ছে রুপালি আলোয়।বেরিয়ে পড়লাম,আস্তে আস্তে এগিয়ে চললাম ঢেউ এর কাছে।চাঁদের আলোয় গা ভাসিয়ে ঢেউগুলো সাগরতট কে চুম্বন করে চলেছে।সূর্যোদয় হতে এখনও দেরি আছে।
      আস্তে আস্তে আকাশ লাল,হলুদ,কমলা বর্ন ধারণ করতে শুরু করল,তার সেই রঙের ছটায় বিস্তীর্ণ জলরাশিও রঙিন হয়ে উঠতে লাগল।প্রকৃতির লীলাখেলার এক অপরূপ দৃশ্য প্রানভরে উপভোগ করতে লাগলাম।শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করলাম,নিজেকে সপে দিলাম  ধরিত্রীর বুকে। জ্যান্ত ঝিনুক, কাঁকড়া বিচে ঘোরাফেরা করছে, মাছরা পাখনা নেড়ে জলে সাঁতার কাটছে,সবাই যে যার আপন কাজে ব্যস্ত, সবকিছু নিঃশব্দে ঘটে চলেছে।বিধাতার কি অপার লীলা ভাবলে অবাক লাগে।
     সূর্যোদয় দেখে কটেজে ফিরে ব্রেকফাস্ট সেরে রেডি হয়ে চললাম বোটে করে Turtle watching এ।সমুদ্রের বুকে ঝাঁকে ঝাঁকে বড়, মেজ, সেজ, ছোট নানা সাইজের কচ্ছপ ঘুরে বেড়াচ্ছে।গ্লাস বোটে যাবার ফলে তাদের জলক্রীড়া পরিস্কার দেখতে পাচ্ছিলাম।স্বচ্ছ নীলাভ সবুজ জলে তাদের দৌড়াদৌড়ি দেখতে দেখতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেল।এরপর ফিরে এসে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কাঁদমাত দ্বীপে।
#Stayhome

Post a Comment

0 Comments