এক মধ্যবিত্ত বাড়ির দুর্গাপূজা ও খাওয়া দাওয়া
কাশিমবাজার রাজবাড়িতে খুব ধুম করে দুর্গাপূজা হতো | তবে শুনেছি সেই পূজোয় নানা জাকজমক, আমোদ প্রমোদ , ফুর্তির ব্যবস্থা থাকলেও -- খাওয়া দাওয়ার বিভাগটি নাকি বেশ ধোঁয়াটে ছিল | বিশেষ করে সাধারণ নিমন্ত্রিতদের জন্য | তাঁরা নাকি এক পেট খিদে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতেন কখন একটু প্রসাদ পাওয়া যাবে এই আশায় |
আমার পরিবার কস্মিনকালেও রাজা-গজা দূরের কথা, জমিদার তালুকদারও ছিল না | তাও কোনো কারণে আমাদের পরিবার আট পুরুষ ধরে দুর্গাপূজা করে আসছে -- ২৫০ বছর পেরিয়ে গেছে | একবারের জন্য বন্ধ হয়নি | ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ঝড় , ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ , দেশভাগ, ১৯৭৮ এর বন্যা সত্ত্বেও আমাদের পরিবার পুজো চালিয়ে এসেছে | কলকাতা আর পশ্চিমবঙ্গের সাবেকি বনেদি পুজো বলতে পুরোনো রাজবাড়ী বা জমিদারবাড়ির পুজোই বোঝায় | অন্ততঃ পত্র -পত্রিকা , পুজোর ক্রোড়পত্র পড়লে তেমনটাই মনে হয় | অনেক মধ্যবিত্ত বাড়িতে যে বংশানুক্রমে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে তার খবর বড়ো একটা কেউ রাখে না | আমাদের পরিবার বরাবর খুব সাধারণ | আমাদের বাড়ির দুর্গাপূজার খাওয়া দাওয়াও জমকালো কিছু নয় | আমার বড়জেঠু বলতেন -- মনে রেখো, বাড়িতে মেয়ে আসছে , কুটুম নয় | ভোগের পদ সেরকম ভাবে করতে হবে | পুজোর খাওয়া সংক্রান্ত কিছু প্রথা বংশানুক্রমে চলে আসছে | কিছুটা পরিবর্তন - পরিবর্ধন করে আমরা আজও চালিয়ে যাচ্ছি পারিবারিক প্রথা |
দেশভাগের পর আমার দাদু বিশাল পরিবার নিয়ে এপার বাংলায় চলে আসতে বাধ্য হন | ১৯৪৯ এ উনি বালির আধা শহর - আধা গ্রাম এক এলাকায় বেশ খানিকটা জমি জায়গা , পুকুর নিয়ে বাড়ি করেন | পুজোর জন্য তৈরী হয় আলাদা মণ্ডপঘর , রান্না ঘর | নতুন পাড়ায় সবাই আমাদের মতো নতুন শিকড় খোঁজার দলে | বারোয়ারি পুজো করার অবস্থা তখনও হয়নি | সবাই মিলে আমাদের বাড়ির পুজো নিয়ে মেতে উঠলেন |
প্রতিদিন গড়ে ২০০ লোক ভোগ ও ফল প্রাসাদ পেতেন | ফল প্রসাদের সঙ্গে দেওয়া হতো মোয়া , নারকোলের নাড়ু, তক্তি | আমাদের অনেক নারকোল গাছ ছিল | সেই নারকোল কুড়ে বাড়ির মেয়েরা নারকোলের মিষ্টি করতেন | নারকোল পাক দেওয়ার ঘন মিষ্টি গন্ধে আমরা মা জেঠিদের আশে পাশে ঘুরঘুর করতাম | আমাদের বড়মা একটু বেশি আসকারা দিতেন | উনি নারকোল পাক ছাঁচে দেওয়ার আগে ইচ্ছে করে খানিকটা মাটিতে ফেলে বলতেন -- তরা আয় , এইটা নিয়া za | মাটিতে পইড়া গ্যাসে, puzar কামে লাগবো না | তরা খা গিয়া | আরেকটু পর আইলে আরেকটু পাবি | অখন za , ঠাকুরের প্রসাদে লোভ দিতে নাই |
বহুদিন পর্যন্ত ভোগ রান্না করতেন বাড়ির মেয়েরা | সঙ্গে হইহই করে কাজে লেগে যেতেন পাড়ার মেয়েরাও | পরে ঠাকুর দিয়ে রান্না শুরু হয় - তবে বাড়ির মেয়েদের তত্ত্বাবধানে | বাড়ির লম্বা টানা বারান্দায় সবাই জমিয়ে বসে কুটনো কাটতেন | গুঁড়ো মশলার চল ছিল না | হামানদিস্তায় মশলা পেশা হতো | আমাদের ঘট বসে পঞ্চমীর দিন | সেদিন থেকে শুরু হয়ে যায় নারায়ণের ভোগ -- পরিবারের লোকজনদের জন্য | মূল নিমন্ত্রণ সপ্তমী থেকে দশমী | নিমন্ত্রিতদের সব খাবার মা দুর্গাকে ভোগ হিসেবে উৎসর্গ করে পরিবেশন করা হতো | শুধু ভাত রান্না করা হতো আলাদা করে | সবার আগে অবশ্য পরিবেশন করা হতো ভোগের ভাত আর ৫ রকম ভাজা | এক এক দিন এক এক রকম |
ভোগের পদ খাঁটি বাঙালি ঘরানার রোজের রান্নার মতন | আমাদের পরিবারে ঘটি বাঙালির মিশেল অনেকদিন ধরেই | ভোগের পদেও তার ছাপ থাকে | ভোগের ভাতের পর গরম ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাত | আর শুক্ত | কোনোদিন ঘটি শুক্ত | কোনোদিন ঢুলা (লাল শাকের) শুক্ত | তারপর ডাল | দশমীর দিন অবশ্যই বিউলির (কলাইয়ের) ডাল | সঙ্গে দুরকম তরকারি | একদিন অবশ্যই দুই কুমড়োর ঘন্ট হয় -- চালকুমড়ো আর মিষ্টিকুমড়ো দিয়ে | তারপর ঢাকা বিক্রমপুরের পূর্ববঙ্গীয়দের বিখ্যাত ভুনিখিচুড়ি | সঙ্গে লাবড়া | এই আঁটোসাঁটো ভুনিখিচুড়ি রান্না করার কেরামতি আলাদা | নিমন্ত্রিতরা আমাদের বাড়ির ভুনিখিচুড়ি বিশেষ পছন্দ করে |
অষ্টমীর দিন মাকে খিচুড়ির বদলে পোলাও ভোগ দেওয়া হয় | সঙ্গে আলুফুলকপির ডালনা | আমরা বহুদিন বাবার চাকরিসূত্রে পূর্ব বিহারের ভাগলপুর আর সাহেবগঞ্জে থাকতাম | ভাগলপুরে এক অসাধারণ চাল পাওয়া যেতো -- কাতারনি চাল | স্বাদে গন্ধে দেরাদুন রাইসকে ছাড়িয়ে যেতো এই চাল | আমরা বিহার থেকে এই চাল আর খাঁটি ঘি নিয়ে আসতাম পোলাও ভোগের জন্য | পুজো চলাকালীন পোলাও-ধুপ-ধুনো - ফুলের এক গাঢ় গন্ধ ভেসে বেড়াতো সারা বাড়িতে | ঢাক আর কাঁসর-ঘন্টার আওয়াজের সঙ্গে |
সপ্তমী থেকে নবমী মাকে ইলিশ মাছের ভোগ দেওয়া হয় | নবমীর পর থেকে আমাদের পরিবারে ইলিশ খাওয়া বন্ধ থাকতো সরস্বতী পুজো পর্যন্ত | শুনেছি ইলিশের সংরক্ষণের জন্য পূর্ববঙ্গের অনেক এলাকাতেই এই প্রথা চালু ছিল | ভোগের ইলিশ নিমন্ত্রিতদের খুব পছন্দের ছিল | আর ছোটবেলায় আমাদের প্রিয় ছিল ইলিশের ডিমভাজা | বাড়ির ছোটদের নিমন্ত্রিতদের আগে খাওয়ার নিয়ম ছিল না | ফল প্রসাদ নিয়ে আমরা জল - লেবু - লংকা - নুন দিতাম দাদাদের সঙ্গে | আর পরিবেশনের আগে আমি আর আমার খোকনদা এদিক ওদিক তাকিয়ে বেশ কিছু ইলিশের ডিমের বড়ার সদ্গতি করে চাগার দেওয়া খিদে খানিক ঠান্ডা করতাম |
ইলিশের পর চাটনি নয় -- লম্বা টক দেওয়া হয় | কোনোদিন চালতের, কোনোদিন জলপাই বা তিল-আমশির | একটু দ্রুত হাত না চালালে কলাপাতার একদিক থেকে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা | টকের পর পায়েস | নবমীর দিন এর পর দেওয়া হতো কলার বড়া আর আম-ক্ষীর |
দশমীর ব্যাপারটা একটু আলাদা | দর্পন বিসর্জন হয়ে যায় সকাল আটটার ভেতর | তারপর একটা এলিয়ে পড়া ভাব | মায়ের বিদায়বেলার বিষাদ মেশানো | পুজোর কদিন জলখাবারের ব্যবস্থা থাকে না | তাই দশমীর দিন জোরালো জলখাবার | লুচি - আলুর দম বা কাবুলিচানার ঘুগনি | শেষ পাতে গরম জিলিপি আর বোঁদে | ছোটদের ভেতর লুচি খাওয়ার প্রতিযোগিতা লেগে যেতো | বিরাট খাবার ঘরে সবাই গোল হয়ে বসতাম | খাওয়ার পর পাতে বসেই জমাটি আড্ডা |
দশমীর ভোগ একটু আলাদা | সেদিন ভোগের পুরোভাগে শীতল-পান্তা ভাত | গরম ভাত তৈরী করে তার ভেতর জল ঢেলে করা হয় এই শীতল-পান্তা | তার ভেতর দেওয়া হয় শাপলা , পাকা কলা, গন্ধরাজ লেবু আর নারকোলের টুকরো | সঙ্গে কচুর শাক ছোলা দিয়ে | সেদিন ঘন বিউলির (কলাইয়ের) ডাল হয় | দশমীর দিন দুপুরে বোয়াল মাছ হতেই হবে | ঘন সর্ষে বাটা দিয়ে ঝোল | আর তারপর বোয়াল মাছের ঝাল ঝাল কাটা চচ্চরি | বোয়াল মাছ অবশ্য ভোগে দেওয়া হয় না | আমাদের বিসর্জন দুপুরের ভেতর দিতে হয় | আত্মীয় বন্ধুরা গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে এসে বিদায়ী ভোগ প্রসাদ পান |
দশমীর রাতে কারো বিশেষ খিদে না থাকলেও একটি প্রথার জন্য সবাইকে খেতে বসতেই হবে | দুপুরে একটি ছোট রেকাবিতে এক জোড়া পুঁটি মাছ দেখিয়ে নিয়ে যান বাড়ির মেয়েরা | বলা হয় যাত্রা পুঁটি | এই পুঁটি মাছ ভাজা দিয়ে অল্প হলেও একটু ভাত খেতেই হবে দশমীর রাতে | একাদশীর দিন সবাই বেশ চনমনে | সেদিন দুপুরে মাংস ভাত খাওয়ার রেওয়াজ | আমাদের পূজোয় বলি বন্ধ হয়ে গেছে ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ঝড়ে | পাঁঠা মরে গিয়েছিলো বলে | বলির খাঁড়াটি যদিও রয়েছে এখনো | নবমীর দিন রাতে পরিবারের সবার মাথায় ছোঁয়ানো হয় | মাংস আনা হয় বাজার থেকেই | কিন্তু একাদশীর ঝোলটি রান্না হয় পেঁয়াজ রসুন ছাড়াই | যেমন হতো বলির মাংসের ঝোল একশো বছর আগে |
কালের অমোঘ নিয়মে মা - বাবা - জেঠু - জেঠিমারা চলে গেছেন | পরিবারের নতুন প্রজন্মের প্রায় সবাই বিদেশে | আমিও বিলেত প্রবাসী গত ২৩ বছর | অর্থবলে বলীয়ান হলেও পরিবারের লোকবল কমে আসছে | এখন পুজোর দায়িত্বে আমার তিন দাদা | বৌদিরা ভোগ রান্না করেন এখনো -- তবে অল্প | নাড়ু তক্তি মোয়া এখনো বাড়িতেই তৈরী হয় | নিমন্ত্রিতের সংখ্যাও কমে নি -- কিন্তু তাঁদের জন্য ক্যাটারার এর খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে | সঙ্গে অল্প পরিমাণে পুজোর ভোগ | পারিবারিক প্রথা মোটামুটি বজায় আছে | নিমন্ত্রণের পদও আগের মতোই আছে প্রায় | এখনো মা দুর্গা তাঁর পরিবার নিয়ে শীতল -পান্তা আর কচুর শাক খেয়ে, আমাদের বাড়ি থেকে , আমাদের মতো আরো অনেকের বাড়ি থেকে কৈলাশের দিকে যাত্রা করেন |
Special Thanks to ডাঃ পাঞ্চজন্য ঘটক





0 Comments