দিনটা ছিল মকর সংক্রান্তির দিন l সেই একদিনের ছুটিতে শীতকালীন একদিনের অরণ্যের স্বাদ নিতে আমাদের বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক মিলে একটা স্করপিও রিজার্ভ করে গিয়েছিলাম চিল্কিগড়, ঝাড়গ্রাম আর বেলপাহাড়ি l তারই টুকরো টুকরো স্মৃতি জোড়া লাগিয়ে শুরু করছি আমার আর এক ভ্রমণ সিরিজ অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রাম l
মকরের দিন খুব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম মেদিনীপুর থেকে l চাঁদড়াতে সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে ফেললাম l তারপর কাঁসাই নদীর ওপর ব্রিজে দাঁড়িয়ে নদী বক্ষের কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম l শীতের সকালl ঠান্ডা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে l চারদিকে হালকা কুয়াশা l শীতের চাদরে মোড়া চারদিক l আমরা চললাম চিল্কিগড়ের উদ্দেশ্যে l রাস্তা অসাধারণ সুন্দর l কালো পিচের মসৃন রাস্তা l আর দুই ধারে জঙ্গল l বিশেষ করে শাল মহুয়ার জঙ্গল l কোথাও অবারিত মাঠ l আর খেজুর তাল গাছের ছড়াছড়ি l রাস্তা বড্ডো মনোরম l আর এরকম ফাঁকা রাস্তায় যেতে যেতে মনে হতেই পারে এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলতো? কিন্তু শেষ হয়তো হয়না l নিজেদের থেমে যেতে হয়, বেঁকে যেতে হয়, পথ ছেড়ে অন্য পথে যেতে হয় l যাইহোক ঝাড়গ্রাম জেলা আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে l ও হ্যাঁ আমরা সবাই জানি জঙ্গল মহল এই ঝাড়গ্রাম এখন একটা নবগঠিত জেলা l এই ঝাড়গ্রাম সম্পর্কে কয়েকটা কথা না বললে কেমন ধারণাটা পরিষ্কার হয়না l
ঝাড়গ্রাম জেলা হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেদিনীপুর বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা। এটি বনপাহাড়ির বনভূমির সৌন্দর্য এবং বেলপাহাড়ী পাহাড়ের জন্য বিখ্যাত। জেলার উত্তরে কাকরাঝোড় এবং দক্ষিণে সুবর্ণরেখা নদী। এটি বন্যপ্রাণীদের জন্য ভালো বাসস্থান এবং পর্যটকদের জন্য একটি প্রিয় গন্তব্য। প্রাচীন মন্দির, রাজপ্রাসাদ এবং লোক সুরগুলি এই এলাকাটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে। ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম মহকুমাটিকে নিয়ে এই জেলাটি আত্মপ্রকাশ করে l এটি পশ্চিমবঙ্গের বাইশতম জেলা।ঝাড়গ্রাম জেলার জেলাসদর হল ঝাড়গ্রাম শহর।
অতীতে একসময় এখানে যখন উপজাতিদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয় তখন সম্রাট আকবর সেই বিদ্রোহ দমন করার জন্য মানসিংহকে এখানে পাঠানl সালটা ছিল 1592, সর্বেশ্বর সিং ও তার বড়দাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো এখানকার বিদ্রোহীদের দমন করারl তখন সর্বেশ্বর সিংহ রাজপুত দের সাহায্য নিয়ে জঙ্গলে বিদ্রোহীদের দমনের কাজ করেনl পরবর্তীকালে এখানে একটি নতুন রাজ্য গঠিত হয়l তারপরে রাজপূত্রা বাংলাকে দুটি ভাগে ভাগ করেl একটি ভাগের রাজধানী হয় ঝারগ্রাম ও অন্যটির রাজধানী হয় বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরl
ছোটনাগপুর মালভূমি ক্রমশ ঢালু হয়ে মিশে গিয়েছে এবং ঠিক এই মিশে যাওয়া অঞ্চলটিতে গড়ে উঠেছে জঙ্গলময় ঝাড়গ্রাম l এখানকার মাটি ল্যাটেরাইট মাটি ধরনেরl আবহাওয়া বেশ রুক্ষ্ম শুষ্ক l গরমের দিনে অত্যন্ত গরম পড়ে আর শীতের দিনে বেশ জাঁকিয়ে শীত পড়ে বৃষ্টিপাত বেশি হয়l
ঝাড়গ্রাম উপজাতীয় নৃত্যের স্বর্ণ কোষাগার। এই উপজাতি নৃত্যের কিছু বিলুপ্তির পথে। চুয়াং, চ্যাং, চউ, ড্যাংগ্রে, ঝুমুর, পান্তা, রণপা, সাহারুল, টুসু ও ভাদু ইত্যাদি মানুষের সৃজনশীল শিল্পের কিছু শিল্পকর্মের একটি নিখুঁত অভিজ্ঞতা নয়, বরং একটি সভ্যতার প্রয়োজনীয় মাত্রার মাধ্যমে একটি আকর্ষণীয় সাহসিকতা, এর যৌথ অগ্রাধিকার, তাদের বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং দর্শন তাদের জানা।
উপজাতীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি নিয়মিত বাঙালির উৎসব যেমন দুর্গা পূজা, সরস্বতী পূজা এবং কালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া শীতলা,মনসা, দোলযাত্রা, রাস যাত্রা, জন্মাষ্টমি, ভীম পূজা, জগন্নাথের রথযাত্রা প্রভৃতি পূজায় সাথে অন্যান্য সাধারণ পূজাও সংঘটিত হয়।
ঝাড়গ্রামে অনেক মেলা এবং সভাযাত্রা স্থান পায়। ঝাড়গ্রামের বিখ্যাত মেলা হল জঙ্গলমহল উৎসব, ঝাড়গ্রাম মেলা ও যুব উৎসব, রঙ্গ মাটি মনুষ, শ্রাবনী মেলা, বৈশাখী মেলা, মিলন মেলা l
এবার আসি আমাদের গল্পেl বেলা 11 টা নাগাদ আমরা ডুলুং নদীর তীরে পৌঁছে গেলামl একটা জায়গায় গাড়ি পার্ক করে আমরা হাটতে লাগলামl ততক্ষণে ঝলমলিয়ে রোদ উঠেছেl চিল্কিগড় জায়গাটা পাথরময় l কিছুটা হেঁটে যাওয়ার পরেই আমরা দেখতে পেলাম আঁকাবাঁকা সরু একখান নদীl যার নাম ডুলুং নদীl মহাশ্বেতা দেবীর গল্প পড়তে গিয়ে এই দুটো নদীর কথা পড়েছিলামl আজ চোখের সম্মুখে সেই ডুলুং নদী তাই তার ক্ষীণ কলেবর নিয়ে বয়ে চলেছে l বয়ে চলেছে বললে ভুল বলা হবে l নদীতে এতো টুকুও স্রোত নেই l ধীর স্থির l জল কিন্তু কাঁচের মতো স্বছ l আর খুবই শীতল l জল কমে গিয়ে নদীর বক্ষদেশের পাঁজর বেরিয়ে এসেছে l চারদিকে পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে l কোথাও একটু গর্ত বেশি l সেখানে জল বেশি l স্নান করা যাবে এমন l বালি বেশ মোটা l বালির থেকে কাঁকর বেশি l বিভিন্ন ঋতুতে এই নদী রূপ বদল করে l বর্ষায় ভয়াবহ রূপ ধারণ করে l দুকূল ছাপিয়ে বন্যাও সৃষ্টি করে কখনো কখনো l শীতে ক্ষীণ ধারা l আর গ্রীষ্মে একদম শুকনো কাঠ এই নদী l শরতের দুই কুল কাশ ফুলে ভরে যায় l ঝাড়গ্রাম শহর থেকে 15 কিমি দূরে এই চিল্কিগড় আর ডুলুং নদী l নদীর তীরে প্রাচীন মন্দির আর জীববৈচিত্রে পরিপূর্ণ জঙ্গল l শীতকাল এই নদীর তীরে পিকনিক করতে যায় বহু মানুষ l ডুলুং নদী সুবর্ণরেখা নদীর একটা উপনদী l রোহিনীর কাছে সুবর্ণরেখার সাথে মিলিত হয়েছে l আমরা হালকা পা ডুবিয়ে বা পাথরে পাথরে পা দিয়ে নদী পেরিয়ে ওপারে কনক দূর্গা মন্দিরে গেলাম l পরের পর্বে সেই গল্প হবে l আজ এই পর্যন্ত l
বিশেষ অনুরোধ : ঝাড়গ্রাম এখন একটা বেশ আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র l তাই অবশ্যই আসুন জঙ্গল সুন্দরী ঝাড়গ্রামে l ঝাড়গ্রাম, বেলপাহাড়ি, চিল্কিগড় আরো বহু জায়গা আছে ঘোরার l কিন্তু প্লাস্টিক পলিথিন ফেলা থেকে বিরত থাকুন l সবুজ সুন্দর রাখুন এই ঝাড়গ্রামকে l
Collected



















0 Comments