চন্ডিগড় - সিমলা - কুফরি - ফাগু

২০১৯ এর অক্টোবর মাসে পুজোর ছুটিতে 14 দিনের লাহুল স্পিতি বেড়ানোর গল্প নিয়ে আমার প্রথম নিবেদন। 


 (চন্ডিগড় - সিমলা - কুফরি - ফাগু - সারাহান - সাংলা - ছিটকুল - কল্পা - খাব - হাংরাং ভ্যালি ও পু ব্লক -  নাকো - টাবো - ধানকার - পিন ভ্যালি - কাজা - হিক্কিম - লাঞ্জা - কোমিক - চিচাম ব্রিজ - কিয়াটো - লোসার - কুঞ্জুম পাস - রোটাং পাস - মানালি) 
   

                                     ল্যাঙ্গজা 


কাজা থেকে ৮ কিমি দূরে  আরও এক নিসর্গের ঠিকানা যা 14300 ফুট বা 4420 মিটার উচ্চতায় হিমাচল প্রদেশের  স্পিতি উপত্যকায় একটি বাটি আকারের অঞ্চলে পাহাড়ের মাঝখানে ল্যাংজা নামে ছোট্ট প্রত্যন্ত গ্রাম। হিমেল বাতাস মাখা এই গ্রামে রয়েছে সুন্দর মনাস্ট্রি। কয়েক ঘর মানুষের বাস। গ্রামের ওপর দিকে রয়েছে প্রায় ১০০০ বছরের পুরনো বুদ্ধ মূর্তি৷ যেখানে পাওয়া যায় নানা রকম ফসিল৷

ল্যাঙ্গজা একটি মোটরেবেল রাস্তা সহ বিশ্বের অন্যতম উঁচু গ্রাম হিসাবে বিবেচিত হয়। চীনের তিব্বতের সান্নিধ্যের কারণে এই গ্রামের জনসংখ্যা মূলত বৌদ্ধ এবং তিব্বতিয়ান বৌদ্ধ ধর্মের সাক্যপা সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। গ্রামটির জনসংখ্যা প্রায় ১৩৭জন ৩৩টি বাড়িতে বাস করে।       
  
প্রায় পাঁচ কোটি বছর আগে, আংগারাল্যান্ড ও গন্ডোয়ানাল্যান্ডের টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে সংঘর্ষ থেকে উত্থিত হয়েছিল হিমালয় পর্বতমালা এবং তিব্বত মালভূমি। টেথিস সমুদ্রের নিচে বাস করা সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম আজ ল্যাংজা এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে পাওয়া যায়। ল্যাংজার আশেপাশে তাই জীবাশ্ম পাওয়া যায়।     

লাংজা-কোমিক-হিক্কিম – এই তিনটে জায়গাতেই পাওয়া যায় ট্রায়াসিক-জুরাসিক যুগের প্রাচীন ফসিল।  এ সেই যুগের কথা, যখন হিমালয় বলে কিছু ছিলো না, ছিলো শুধু  গন্ডোয়ানা ল্যান্ড আর আংগারাল্যান্ড, তার মাঝে টেথিস সমুদ্র। সেই সমুদ্রের একটা অংশ পরে টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়ায় টেথিস সাগরের পলি ভাঁজ প্রাপ্ত  হয়ে সৃষ্টি হয়ে  যায় হিমালয়। সেই থেকে এখানে রয়ে গেছে সামুদ্রিক সব প্রাণীদের ফসিল। ল্যাংজা গ্রাম জীবাশ্মের জন্য বিখ্যাত । এ কারণে গ্রামটি "জীবাশ্মের গ্রাম" নামেও পরিচিত। এটা বিশ্বাস করা হয় যে এই অংশটি একসময় টেথিস সমুদ্রের তলে নিমজ্জিত হয়েছিল এবং এই কারনেই ল্যাংজা গ্রামে এই সামুদ্রিক জীবাশ্মের প্রাচুর্য।  স্থানীয়রা এই জীবাশ্মগুলিকে “চৌদুয়া” বলে ডাকে। এছাড়াও, "চৌদুয়া কেন্দ্র" নামে একটি স্থানীয় জীবাশ্ম কেন্দ্র রয়েছে যেখানে আপনি জীবাশ্মের সংগ্রহ খুঁজে পেতে পারেন। 

পাললিক শিলার নীচে প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক প্রাণী এবং উদ্ভিদের জীবাশ্ম পাওয়া যায়। এই জীবাশ্মগুলি কয়েক মিলিয়ন বছর পুরানো। যদিও জীবাশ্মের দখল ও সংগ্রহ ভারতে অবৈধ, তবে গ্রামের স্থানীয়রা এইসব ভ্রমণকারীদের কাছে বিক্রি করে।

আমাদের সংগ্রহের তালিকায় আরো একটি নাম জুড়ে গেল আর সেটা হল জীবাশ্ম। ১০০ টাকার বিনিময়ে ৩ টি জীবাশ্ম। এতদিনের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপায়িত হল।  বইয়ের পাতার ছবিগুলোকে চাক্ষুষ করলাম,  তাকে স্পর্শ করে জীবন সার্থক করলাম। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রাজীব পাটনায়েকের জার্নাল পরে জানতে পারি যে  আমরা লাঙ্গজার যে জীবাশ্ম নিয়ে এসেছি তা জুরাসিক যুগের শেষের এবং প্রায় দেড় কোটি বছর পুরানো।  

গ্রামের ঢুকতেই প্রথম নজরে পড়বে একটি বিশাল সোনার বর্ণের বুদ্ধ মূর্তি। ধারণা করা হয় যে এটি প্রায় 1000 বছরের পুরানো। গ্রামের সমস্ত বাড়িঘর এই মূর্তির নীচে নির্মিত। ঘরগুলি কাদা দিয়ে তৈরি এবং তাদের চারপাশে প্রার্থনার পতাকা বাঁধা রয়েছে। বিগত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে পর্যটন যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তত বেশি সংখ্যক বাড়িগুলি ভ্রমণকারীদের আবাসন এবং খাবারের বিকল্প সরবরাহের জন্য হোম স্টে পরিণত হয়েছে।




 লাংজা একটি ছোট গ্রাম যা "চাও চাও কাং নেলদা" পর্বতের গোড়ায় অবস্থিত। এটি "রাজকন্যা পর্বত" নামেও পরিচিত। লাংজা গ্রামটি দুটি পাহাড়ে অবস্থিত একটি উপরে ল্যাংজা গংমা এবং নীচের ল্যাংজা ইওংমাতে বিভক্ত। লাংজা গ্রামে কৃষি এখন প্রধান পেশা। লোকেরা তাদের খাদ্যের পাশাপাশি আয়ের উৎসের জন্য এটির উপর নির্ভর করে। এখন এই অঞ্চলে পর্যটন বিকাশ ঘটছে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের উপার্জনও যুক্ত করেছে। তবে, পশুপালন পালন এবং কৃষিকাজ এখনও মূল পেশা।




গ্রামে কয়েকটি হোমস্টে রয়েছে, যা যথেষ্ট আরামদায়ক। জল খুব দুর্লভ এই গ্রামে। এ কারণে বেশিরভাগ হোমস্টেতে শুকনো কম্পোস্টিং টয়লেট রয়েছে। এটি মানব বর্জ্যের একটি পরিবেশ বান্ধব সমাধান এবং প্রচুর পরিমাণে জল সাশ্রয় করে। আস্তে আস্তে কয়েক বছর ধরে ল্যাঙ্গজা  বিভিন্ন কারণে স্পিতি উপত্যকায় আগত ভ্রমণকারীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

ল্যাংজা এর নাম 'লা' (পর্বতমালা) এবং 'জা' (জামা থেকে) থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। অন্য একটি তত্ত্ব অনুসারে, ল্যাঙ্গজার নাম 'ল্যাঙ্গ' থেকে গৃহীত হয়েছিল অর্থাৎ গ্রামে ল্যাং নামে একটি  প্রাচীন মন্দির রয়েছে যা থেকে "লাংজা" নামটি ধারণ করে। এই প্রাচীন ল্যাং মন্দিরটি স্পিতি উপত্যকার সমস্ত ধর্মাবলম্বীদের আবাসস্থল বলে বিশ্বাস করা হয়। লাংজা গ্রামে  বুদ্ধের একটি বিশাল মূর্তি রয়েছে  যা স্থানীয় বিশ্বাস অনুসারে গ্রামটিকে সমস্ত মন্দ থেকে রক্ষা করে। এই আইকনিক বুদ্ধা মূর্তি ল্যাঙ্গজার জন্য একটি বিখ্যাত প্রতীক হয়ে উঠেছে।




ল্যাংজা গ্রামের নিকটে দুটি উচ্চ উচ্চতাযুক্ত  হ্রদ রয়েছে। একটি হ'ল টিসনয়েটি হ্রদ, যা 4526 মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। অন্যটি হ'ল চুমো তসো হ্রদ যা টিসনয়েটি হ্রদের চেয়ে কিছুটা বড়। চুমো তসো হ্রদের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 4619 মিটার উপরে। আপনার অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে এই হ্রদ দুটিই 2 - 4 ঘন্টা হাঁটার পরে পৌঁছতে পারা যায় । তবে যদি প্রথমবার যান তবে আপনার সাথে কোনও লোকাল নেওয়া অবশ্যই দরকার। আর আমাদের এ যাত্রায় আর ঐ উচ্চ উচ্চতা যুক্ত হ্রদ দেখতে যাওয়া হল না। তাই ড্রাইভার ভাইয়ের থেকে গল্প শুনে রণে ক্ষান্ত দাওয়াই  শ্রেয় মনে করলাম। তবে সাহসী ব্যক্তিরা অবশ্যই দেখে আসতে পারেন।


Collected..
By Uma Mondal

Post a Comment

0 Comments