এই_তো_জীবন

এই_তো_জীবন

কটা দিন হাড় ভাঙা খাটুনির পর আজ শনিবার একটা ছুটি পেয়েছি। পুরো উশুল করেই ছাড়বো। গিন্নিকে বলে দিয়েছি, আজ ন'টার আগে উঠব না। তারপর সারাদিন যা বলবে বাধ্য গাধার মত করে দেব। মোবাইলে দেওয়া রোজকার ৭টা, ৭টা দশ, ৭টা পনেরো এবং ৭টা কুড়ির অ্যালার্ম গুলো বন্ধ করে দিলাম।
কিন্তু কপালে শনির দশা লেগে থাকলে খন্ডাবে কে? ৮টা তিন হয়েছে সবে, ওমনি 'ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বহে কিবা মৃদু বায়' বেজে উঠল। শ্লা, মোবাইলটাই সাইলেন্ট করতে ভুলে গেছি। অমনি...
গিন্নি বলল, 'কই গো, শুনছো, তোমার ফোন বাজছে'
--হুঁ।
--তোমার ফোন বাজছে।
--হুঁ।
-- দু বার বাজলো এই নিয়ে।
-- বস করেছে?
-- কে বশ করেছে? কি উল্টোপাল্টা বলছো? কালকের হ্যাংওভার কি এখনও কাটেনি নাকি! এই আজ পর্যন্ত তোমাকে কেউ বশ করতে পেরেছে! তিন বছর সংসার করছি, পাগলা ঘোড়া যেমনকার তেমনই রয়ে গেল, আমিই বশ করতে পারলাম না! তো অন্য কেউ কী করে বশ করবে শুনি? 
--'হে ভগবান' বলে কানের উপর বালিশটা চেপে ধরলাম।
--আজকাল স্বপ্নে-টপ্নে কেউ বশ করেছে নাকি? নাকি ডুবে ডুবে জল খাচ্ছ ? আজকাল তো পরকীয়া টরকীয়া! 

এরই মধ্যে আবার 'ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বহে কিবা মৃদু বায়'...

আমি বললাম, ফোনটা ধরো, যদি বি ও এস এস বস হয়, তাহলে বলবে, আমি বাজার করতে গেছি, বাড়িতে ফোনটা ভুলে রেখে গেছি।
গিন্নি ফোন ধ'রে বলল, এই দেখো, একটা মেয়ে ফোন করেছে, তোমাকেই চাইছে।
--এই সাত সকালে আবার কে রে বাবা? বিরক্তি সুরে বললাম।
-- নাও নাও, অত ঢং করতে হবে না, ধরো ফোনটা, এই নিয়ে তিনবার হয়ে গেল।
ইতস্তত করে ফোনটা ধরলাম। গিন্নি মাথার কাছে বসে পড়েছে, গোয়েন্দা গিন্নি, ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কিরীটি, মিতিন মাসী ইত্যাদি প্রভৃতি চরিত্র ভর করেছে ওকে। 
ফোনটা কানে ধরে বললাম--হ্যালো।
বউ আমার কানের কাছে মাথাটা হেলাল।
--স্যার, ভেরি গুড মর্নিং। আই অ্যাম কলিং ফ্রম এবিসিডি ব্যাংক। উই হ্যাভ অ্যা স্পেশাল ক্রেডিট কার্ড অফার ফর ইউ স্যার। ইট ইজ লাইফটাইম ফ্রি উইথ নো প্রসেসিং ফিস। ইউ ক্যান পারচেজ আপ টু ওয়ান ল্যাখ নাইনটি থাউজ্যান্ড। অ্যান্ড ইউ ক্যান গেট  রিওয়ার্ডস পয়েন্ট, অ্যান্ড ই এম আই ফেসিলিটি টু পে ইওর আউটস্ট্যান্ডিং বিল, স্যার। অ্যান্ড উই কেয়ার আওয়ার কাস্টমারস বেস্ট এভার সার্ভিস বেটার  দ্যান আদার ব্যাংকস।

সক্কাল সক্কাল ঝাঁট জ্বলে গেল আমার।--বাংলা বোঝেন, বাংলা?
--ইয়েস স্যার, আই অ্যাম তমালিকা ফ্রম বেঙ্গল। বাংলা আমার মাতৃভাষা, স্যার।
--তাহলে শুনুন, আর আপনার ব্যাঙ্ককেও শোনান এটা। আমার কাছে অলরেডি এস বি আই, এইচ ডি এফ সি, আই ডি এফ সি, ইয়েস, আই সি আই সি আই, অ্যাক্সিস, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড সহ আরও চারটে ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড আছে। সব মিলিয়ে কুড়ি-বাইশ লাখ টাকা ক্রেডিট করতে পারবো এক মাসে। আর আমি সামনের মাসে বিয়ে করবো। পালিয়ে। মানে দুলহান কো ভাগাকে। বুঝতে পেরেছেন তো। আর পালাতেই যখন হবে, ঠিক করেছি দেশ ছেড়েই পালাবো ওই কুড়ি লাখ টাকা তুলে। নীরব মোদি আমাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছে। পাথফাইন্ডার অফ এসকেপিং গাইস। তাই আপনারা যদি আরও এক লাখ নব্বই হাজার দিয়ে আমাকে হেল্প করেন, তাহলে হানিমুনটা কঙ্গো থেকে চেঞ্জ করে সিঙ্গাপুর করে নেব ভাবছি। বাকি সিদ্ধান্ত আপনার। আই মিন, আপনাদের...
--ওকে স্যার, থ্যাঙ্কু ভেরি মাচ। অ্যান্ড কনগ্রাচুলেটশনস্ ইন অ্যাডভান্স ফর ইওর ম্যারেজ সেরেমনি অ্যান্ড হানিমুন ট্রিপ। হ্যাভ এ গুড ডে।

ফোন কেটে দিয়ে দেখলাম গিন্নি আমার প্রায় শিয়রে অধিষ্ঠান। রুদ্র মূর্তি ধরব ধরব করছে। তার আগেই বললাম -- শ্লা, ক্রেডিট কার্ডের বাচ্ছা, ঘুমটা ঘেঁটে ঘ করে দিল।
-- অ্যাই, সত্যি করে বলো তো কে করেছিল? ধরা পরে আমার সামনে ক্রেডিট কার্ডের নাটক করছ না তো? তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনি আমি। উপরে ভেজা বেড়াল, ভেতরে হারামীর...
--ধ্যুত তেরি! এ যে কোথায় ফাঁসলাম আমি!
--তা আবার ফাঁসবে না, বাড়িতে ঘরওয়ালি বাইরে ক্রেডিট কার্ডওয়ালি। ওসবের এইখানেই ফুলস্টপ মেরে দাও বলে দিচ্ছি, এর বেশি বাড়বাড়ন্ত যদি করেছ না, আঁশ বটি দিয়ে কেটে পুরো আলাদা করে দেব।
আমি চিৎকার করে উঠলাম--কী?
--ধড় থেকে মাথাটা, আবার কি?

আশ্বস্ত হলাম। কি জানি বাবা, দেবীপক্ষ চলছে। যখন তখন অসুর বধ হয়ে যেতে পারে। 'ধুরছাই' বলে রাগে ফোনটাই বন্ধ করে দিলাম। দেখি, আধ ঘন্টার জন্য সেকেন্ড রাউন্ড একটা ঘুম দিতে পারি কিনা!

দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর মনে পড়ল ফোন তো সেই সকাল থেকে সুইচ অফ! খুলতেই বসের মেসেজ--প্রবাল, আই কলড ইউ টেন টাইমস্, হোয়ার আর ইউ? আই হ্যাভ অ্যান আর্জেন্ট টপিক টু ডিসকাস, কল মি নাউ।
--শ্লা, এই বসটা কে না আমি একদিন খুন করে ফেলব...
--সে তুমি পারবে না। তোমার ওই ফোঁস টুকুই আছে, বাকিটা তো লতানো সাপ।
এই আমার বউটা না শুধু আমার পেছনেই কাঠি করে করেই একটা পি এইচ ডি পেয়ে যাবে। শ্লা, জীবনটাই পুরো ঢ্যামনা সাপ হয়ে গেল।

বসকে ফোন করলাম। --হ্যালো স্যার..
--আরে, মিস্টার তরফদার, সারাদিন ফোনের সুইচ অফ ! ছুটির দিনে কি ফোন বন্ধ করে বউএর সাথে একটু ইয়েটিয়ে হচ্ছিল নাকি? 
--সে কপাল কি আর আছে স্যার, শাকচুন্নি কে বিয়ে করে নিজেই বেম্মদৈত্তি হয়ে গেছি।
মৃদু স্বরে বললাম কথা গুলো। যাতে গোয়েন্দা গিন্নির কানে না পৌঁছায়।
--আরে এই জন্যই তো বলি, মাঝে মাঝে ফ্লেভার চেঞ্জ করো। আজ চকলেট তো কাল স্ট্রবেরি তো পরশু ভ্যানিলা--বুঝলে ইয়ং ম্যান! চেঞ্জ ইস দি সিক্রেসি অফ ইয়োর হ্যাপিনেস...
--হুম। বিজ্ঞের মত ঘাড় নাড়লাম আমি।
--তো বলছিলাম যে, আজ আমার ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। মানে বাইশ বছরের পুরোনো রেজিস্ট্রিকৃত বৌয়ের। হা হা হা হা। তোমার কিন্তু আসা চাই-ই চাই উইথ মিসেস তরফদার।
--আমি তো একাই ঠিক ছিলাম স্যার, আবার লেজুড় টা কেন?
--নো এক্সকিউজ মিস্টার, দুজনকেই আসতে হবে। ইটস আ ফ্যামিলি গেট টুগেদার।

নেমন্তন্ন পেয়ে গিন্নি তো তিনটে থেকে সাজতে বসে গেছে। ঘাড় গলা ইত্যাদি প্রভৃতি নিরন্তর ঘষা মাজা চলছে আয়নার সামনে বসে। ব্রাইডাল কিট টা সামনে রাখা। যা সব সরঞ্জাম বের করেছে, মনে হচ্ছে নিজেরই বিয়ে! চার পাঁচ রকমের এবং সাইজের হেয়ার ব্রাশ, হেয়ার ড্রায়ার, স্ট্রেটনার, ক্রিম্পারস ছড়ানো ছিটানো আছে ড্রেসিং টেবিল জুড়ে। বিছানার এদিক সেদিক ছড়ানো আছে ময়েশ্চারাজিং ক্রিম, কনসিলার, ফাউন্ডেশন, আইব্রো পমেড, আই লাইনার, মাসকারা, হাইলাইটার, আইশ্যাডো প্যালেট, ন্যুড লিপস্টিক সাত-আটটা কালারের। এসব নিয়ে কোনো কমেন্ট করা আমার চোদ্দ পুরুষেরও সাধ্য নেই। আমি তো ছাপোষা আদমি! জিভ ছিড়ে নিয়ে ভেজে খেয়ে নেবে! 
আমি শুধু দরজায় হেলান দিয়ে দেখতে লাগলাম সেইসব সাজের বাহার। 

বিকাল পাঁচটায় যখন আমি রেডি হয়ে বেরোতে যাবো, তখন শ্রী শ্রী মুখঝামটানিদেবীর আদেশ এল, শাড়ির কুঁচি টা ধরে যে একটু হেল্প করতে হয়, সেটা কি রোজ রোজ নেমন্তন্ন করে বলে দিতে হবে। 
অগত্যা...এগিয়ে গেলাম।

--এই সেফটিপিনটা আঁচলের সাথে ব্লাউজে আলতো করে লাগাও...সাবধানে।
লাগলাম। অপটু হতে যতটুকু দক্ষতায় লাগানো যায়! এক দু বার নিজের হাতেই ঢুকে গেল পিনের ডগা, সহ্য করে ব্যথাটা হজম করে নিলাম। শাস্ত্রে বলে গেছে, আপনি রক্তাক্ত হইয়াও প্রেয়সিকে অক্ষত রাখা পুরুষজতির আশু কর্তব্য। 
হাতে আর একটা বড় সাইজের সেফটিপিন নিয়ে বলল--এই পিন টা কোথায় গুঁজি, কোথায় গুঁজি?
--ওটার আবার কি দরকার? এক্সটা নিচ্ছো নাকি?
--না মশাই, এটা আপনার জন্য!
--আমার জন্য? আমি সেফটিপিন দিয়ে কি করবো?
--তোমায় কিছু করতে হবে না, যা করার আমিই করব। তোমায় ফোটাবো। তুমি তো এক পেগ খেলে মেনি বিড়াল থেকে হুলো বেড়াল, দু পেগ পেটে পড়লে নেড়ি কুত্তা, তিন পেগ পড়লে পাগলা ষাঁড়, আর তার বেশি হলে তো বাঘ হয়ে যাও। তাই তোমাকে মনুষ্য দশায় বহাল রাখতে এটা কাজে লাগবে। আর শুনে রাখো, পার্টিতে গিয়ে যদি এতটুকু মাতলামি করেছ বা এক আনার খেয়ে চার আনার বাওয়াল করেছ, তাহলে ওইখানেই সবার সামনে জুতো পেটা করবো। এবারে বাটার স্যান্ডেলটা পড়ে যাচ্ছি, এবারে আর ছিঁড়বে না, মনে রেখো।

কোনো প্রত্যুত্তর তো দূরের কথা, টুঁ শব্দ পর্যন্ত করলাম না। বাইকটা বের করতে করতে নচিকেতার গানের কথা মনে এল--পুরুষ জাতি দুই প্রকার। জীবিত আর বিবাহিত। 

আর আমি? আপনারাই বলুন না হয়... ততক্ষণে আমরা বরং পার্টিটা অ্যাটেন্ড করে আসি।

By দেবব্রত_মল্লিক

Post a Comment

0 Comments