'এক বেলার আশ্চর্য জগৎ নারারা'
কুয়াশা মাখা শহরের ঘুম তখনো ভাঙেনি।পুব আকাশে হালকা আলোর রেখা সবে দেখা দিয়েছে।ছয় দিনের গুজরাট ভ্রমণে আমরা চলেছি কচ্ছ জেলার সদর শহর ভুজ ঘুরে জামনগর থেকে 60 কিমি দূরে নারারার উদ্দেশ্যে।ডিসেম্বরের হাড় হিম করা ঠান্ডায় গাড়ির জানালার কাঁচ খোলা যাচ্ছে না।ঝাপসা কাঁচের মধ্যে দিয়ে শহরের আড়মোড়া ভাঙা দেখতে দেখতে চলেছি। হাইওয়ে দিয়ে যাবার সময় মাঝে আধ ঘন্টার প্রাতরাশ বিরতি নিয়ে আবার পথ চলা।পথে রিলায়েন্স তৈল শোধনাগারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রিলায়েন্স সিটি চোখে পড়লো।গতকাল বিকালে ভুজ থেকে জামনগর পৌঁছে পর্যন্ত ঠিক ছিল না যে আমরা নারারা যেতে পারবো কিনা।বারবার বনদপ্তর কে ফোন করে পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে সন্ধ্যার কিছু পরে দপ্তর থেকে পারমিশন পাওয়া গেলো । ওনারা সকাল নয়টার মধ্যে পৌঁছে যেতে বললেন, কারণ তখন ভাঁটা থাকবে।তাই ভোর থাকতেই বেরিয়ে পড়া।ঘন্টাখানেক পরে হাইওয়ে ছেড়ে ডানদিকে মোড় ঘুরে যে রাস্তায় চলতে লাগলো তাতে মনের আনন্দ দ্বিগুন বেড়ে গেলো।পথের দুধারে নাররায় দেখা যেতে পারে এমন সব সামুদ্রিক প্রাণী ও তাদের পরিচিতি সম্বলিত বড় বড় হোর্ডিং লাগানো রয়েছে।পথে ঘর বাড়ি বিশেষ নেই।ঘন বাবলা গাছের ঝোপ ছাড়িয়ে তৈল শোধনাগারের মোটা পাইপলাইন চলে গেছে।নুন তৈরির ভেড়ি গুলোতে পেলিকান , ফ্লেমিংগো প্রভৃতি পরিযায়ী পাখির মেলা বসেছে।এইভাবে দেখতে দেখতে নারারার মূল গেটে পৌঁছে গেলাম।পর্যায়ক্রমে পারমিট করলাম ও গাইড সঙ্গে নিলাম।কচ্ছ উপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা 163 বর্গকিমি অঞ্চল জুরে ভারতের প্রথম মেরিন ন্যাশনাল পার্ক নারারা, যার অবস্থান Inter Tidal Zone এ।ভাঁটার সময় আরব সাগরের জল দুই তিন কিমি পিছিয়ে যায়,আর উন্মুক্ত করে যায় সামুদ্রিক জীবজগতের অপূর্ব সমারোহ। গাইডের সাথে পা বাড়াবার আগে সবার অবশ্যই কর্তব্য ওয়াটার প্রুফ বা কেডস জাতীয় পা ঢাকা জুতো পরে নেওয়া। প্রথমেই শক্ত ভিজে বালির আঙ্গিনায় পা দিলাম।মাথা উঁচু করে চারিদিকে ম্যানগ্রোভ গাছের অদ্ভুতদর্শন শাসমূল।এরপর খানিকটা যেতেই জলে গোড়ালি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে।আর মাঝে মাঝে গাইড প্রবাল শিলা তুলে তার নীচে লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী তুলে তুলে দেখাচ্ছে।সে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।কি নেই। নানা রঙের স্পঞ্জ, কাঁকড়া, সমুদ্রশশা প্রভৃতি।তবে সব থেকে মজার ছিল পাফার ফিশ দেখা।জলের তলায় দেখলাম চ্যাপ্টা আকারের একটা মাছ। যেই গাইড জল থেকে তুললো অমনি ম্যাজিকের মতো সেই মাছ ফুলে গোল হয়ে গেল। এরই মধ্যে বহু চেনা অচেনা সামুদ্রিক পাখি খাদ্য খোঁজায় ব্যস্ত।এই ভাবে পাড় থেকে আড়াই কিমি যাবার পর জল হাঁটু পর্যন্ত।দিক নির্ণয় করা যাচ্ছে না। দূরে একটি তৈলবাহী জাহাজ কে আরব সাগরের বুকে আবছা দেখা যাচ্ছে। আমার জলে ফোবিয়া আছে। তাই আর এগোলাম না।, ফেরার পথ ধরলাম। পিছনে ফেলে এলাম অচেনা অজানা সামুদ্রিক জগৎকে।কিন্তু যার দেখার অপেক্ষায় ছিলাম সেই অক্টোপাস দেখতে পেলাম না।কিন্তু যা দেখলাম তাই কি কম।আমরা তো বেশিরভাগ জঙ্গল সাফারি করি। কিন্তু এই অন্য স্বাদের সফর মনের মণিকোঠায় চিরকাল থাকবে।তাই জামনগর গেলে অবশ্যই একবেলার জন্য নারারা রাখুন।
কিভাবে যাবেন?.........হাওড়া থেকে জামনগর সরাসরি যায় হাওড়া ওখা লিঙ্ক এক্সপ্রেস।এছাড়া আমেদাবাদ বা রাজকোট ট্রেনে গিয়ে বাকি পথ বাস বা গাড়িতেও যাওয়া যায়।আমাদের যেহেতু প্রথম গন্তব্য ছিল ভুজ তাই গাড়িতে জামনগর এসেছি। দূরত্ব 254 কিমি।
কোথায় থাকবেন? ..........থাকতে হবে জামনগর।হোটেল এর মধ্যে প্রেসিডেন্সি, রিজেন্সি, আশিয়ানা উল্লেখযোগ্য।
মনে রাখার বিষয়........1.জামনগর ফরেস্ট অফিস থেকে আগে থেকে জোয়ার ভাঁটার সময় জেনে নিতে হবে।2.স্নিকার বা কেডস জাতীয় জুতো পরতে হবে।3.জীবন্ত বা মৃত কোরাল বা কোনো সামুদ্রিক প্রাণী সংগ্রহ করে আনা আইনত দন্ডনীয়।4.পানীয় জল ও শুকনো খাবার রাখতে হবে।5.সঙ্গে একসেট শুকনো জামা রাখতে পারেন, বিশেষ করে বাচ্চা থাকলে।6.বয়স্কদের পক্ষে জলের মধ্যে হাঁটা অসুবিধে।তাই না যাওয়াই ভালো।













0 Comments