মেসের ছেলেরা আর মালতী

মেসের ছেলেরা আর মালতী

মেসের ছেলেদের রান্নাটা নিয়েই মালতী ভুল করে ফেলেছে। ছি ছি ছি ছি। একি রে! এই তোরা শিক্ষিত লেখাপড়া জানা চাকরী করতে আসা মানুষ? ছিঃ । এই তোদের খাওয়া দাওয়ার নমুনা? এত বাড়িতে এত বছর ধরে রান্নার কাজ করছে মালতী এরকম কোনো ভদ্দরলোকের বাড়িতে দেখে নি।
ঘড়ি ধরে সকাল সাতটায় আসে মালতী। কি ! না গুছিয়ে রান্না করে রেখে যাবে, ওরা সব খেয়ে দেয়ে নটার মধ্যে বেরোবে। তা কোনোদিন সাতটায় ঢুকতে পেরেছে ফ্ল্যাটে? কোনোদিন না। পনেরো মিনিট ধরে বেল বাজানোর পরে দয়া করে ওদের চারজনের একজন ঘুম চোখে উঠে এসে দরজাটা খোলে। ভাবখানা এই রাতে দরজাটা না বন্ধ করলেই হতো। তাহলে আর কষ্ট করে উঠে আসতে হতো না এখন। দরজা খুলে আধ্ধেক চোখ বন্ধ করে বলবে,”ওঃ তুমি এসে গেছো?”

এই কথাটাই বেলা নটার সময় রায় গিন্নি বলেন।     বলেন‌ হাঁফ ছেড়ে শান্তি পেয়ে। মানে উনি নিশ্চিন্ত। মালতী এবার রান্নাঘরের হাল ধরবে। 
আর এদের ভাবখানা কি? এলে তো এবার , 'কি রান্না করবো কি রান্না করবো' বলে জ্বালাতে? মুখে তো আর এত কথা বলে না! ভাবভঙ্গি দেখেই মালতী বুঝে যায়, “ওঃ  তুমি এসে গেলে?",,,, মরণ দশা আর কি।‌ আসবে না তো কি?

ইনি তো দরজাটা খুলে দিয়েই গিয়ে শয্যা নেবেন। বাকি তিনজন তো সেখানেই পড়ে আছেন।মালতী বেডরুমের দরজায় গিয়ে ওর চিল চিৎকারটা দেয়,”আজ কি রান্না করবো।“
দায় যেন‌ মালতীর। ওদের না।‌ একটা টিপিক্যাল ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বালিশটা উল্টে নিয়ে ওপাশ ফিরে শুয়ে একজন বলবে,”যা খুশি করো না!“

মালতী ঝাঁঝিয়ে বলবে,”সে বুদ্ধি আমার আছে, তোমাদের ভাঁড়ারে তো চাল ছাড়া আর কিছুই নেই, যা খুশি টা করবো কি?”
এবার ওদের একজন বলতে যাবে ,”তাহলে আর কিছু করো না , চলে যাও, আমরা বাইরে খেয়ে নেবো।“

কিন্তু তাকে থামিয়ে আরেকজন বলবে,”পেঁয়াজ ও কি নেই?”

মালতী দেখে এসে বলবে,”তিনটে পেঁয়াজ আছে।“

এতক্ষণের হৈচৈ তে বাবুদের ঘুম ঠিকমতো ভাঙবে। একজন খাটে উঠে বসে বিগলিত হেসে বলবে,”আছে! তিনটে পেঁয়াজ আছে?!! তাহলে আর কি পেঁয়াজ ভাজা আর ভাত করে দাও। বাজার নেই বলছো কেন?”

মালতীর মাঝে মাঝে মনে হয় খুন্তিটাকে ছুঁড়ে দিয়ে চলে যায়। দেবীদি একদিন সব শুনে বলেছিল, তোরই তো মজা । খাটনি কম। মালতী তেড়ে উঠে বলেছে,”দরকার নেই বাপু এরকম খাটনি কমের। পনের মিনিট গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ওদের ডেকে তোলো। আরো কুড়ি মিনিট ধরে জিগাও কি বাজার আছে, আর কি খাইবে। তারপর দেখা যাবে কিছুই নেই। অথচ কাজ ঠিক করার সময় কথা হয়েছিল যে বাজার ওরা করে রাখবে, মালতী একবেলা এসে দুবেলার রান্না করে দিয়ে যাবে। সেই মতো মাইনে। মাস পয়লাতেই গুনে টাকা নেবে, তিনটি হাজার। প্রথম প্রথম ঠিক ই চলছিল। চিকেন , ডিমের কারী, কাটা পোনার ঝোল, সোয়াবিন আলু, মায় খাসি পর্যন্ত রেঁধে খাইয়েছে মালতী ওদের। কিন্তু যত দিন যেতে লাগলো ভেতরের রূপ ধরা পড়ে গেল। চারটে ছেলেই পি পু ফি সু। কুঁড়ের হদ্দ। ওরা মালতীকে মাইনে দেবে, এদিকে বাজার করবে না যাতে এসে মালতী একটু ভালো মন্দ রাঁধতে পারে। কুড়িয়ে বাড়িয়ে যা হোক কিছু একটা ভাতের সাথে মালতীকে করে দিয়ে আস্তে হয়। তাতে ওদের হয় নাকি? সেই ওরা বাইরে খায়ই।‌ সেখানেই যদি টাকা খরচ করবি তো মালতী কে রেখেছিস কেন? রান্নার মাসী তো কি হয়েছে, এত অব্যবস্থা দুচক্ষে সহ্য হয় না মালতীর। ওদের দেখে আর মনে মনে বলে 'এই তোরা শিক্ষিত ছেলে পেলে?'

পেঁয়াজ ভাজার পরেরদিন মালতী ভেবেছিল আজ নিশ্চয়ই ক’টা ডিম রাখা থাকবে ফ্রিজে। মালতীর ধারণা ভুল প্রমাণিত হল। তারা যোগনিদ্রা ভেঙে উঠে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,”ডাল ও নেই?!” মালতী আজ কেমন একটা উদাস হয়ে গেল। জগৎ সংসারে কত কিই ঘটে, মালতীর উত্তেজনাটাই অস্বাভাবিক। ওদের নিস্পৃহতাটাই হয়তো স্বাভাবিক। তাই মালতী আজ চিৎকার করল না , উদাস ভাবেই বলল,”না গো, ডালও নেই। থাকলে তো কাল ডাল করতাম। শুধু পেঁয়াজ ভাজবো কেন।“

তা বটে।

ছেলেরা এবার চিন্তায় পড়লো,”আচ্ছা দুপ্যাকেট পাঁপড় এনে রাখা ছিলো না?”

মালতীর উদাস গলায় হালকা ব্যঙ্গের সুর এলো,”ডাল নেই, তাই শুধু পাঁপড় আর ভাত?”
একজন সমাধান করে দিলো,”তা কেন, প্রথমে পাঁপড় গুলো ভেজে নাও। তারপর কড়ায় জল দিয়ে ঝোল করে পাঁপড় গুলো দিয়ে দাও। পাঁপড়ের ঝোল, আর ভাত।“

অগত্যা। এত কালের রাঁধুনি মালতী। নিজের অভাবের সংসারেও কোনো দিন শুধু পাঁপড়ের ঝোল ভাত রাঁধে নি।

তার পরেরদিন কিন্তু মালতী বেশ ডাঁট নিয়ে এলো। ভুলেও ওদের দরজার সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল না কি রান্না করবে। রেঁধে বেরোনোর সময় দরজার সামনে এলো। তখন ওদের ঘুমও ভেঙে গেছে। ডাঁট নিয়েই বলল,”দাও আড়াই শো টাকা দাও। পোনা মাছের ঝোল করেছি আলু বড়ি দিয়ে। কালকের মাছ তোলা আছে ফ্রিজে। কালকে কালিয়া করবো। পরশু আবার কি করব দেখবো।“

ওরা সানন্দে আড়াইশো টাকা দিয়ে দিলো। দুই তরফই হাঁপ ছাড়লো। “তাহলে এই সিস্টেমই চালু হোক।‘  মালতীও আজ নিশ্চিন্তে বাড়ি গেল।‌ একে বলে খাইয়ে সুখ।




© স্বাতী মুখার্জী


Post a Comment

0 Comments