গল্প হলেও সত্যি

গল্প হলেও সত্যি
--------------------------------
চৈত্রের এক গোধূলি বেলা।
আমি এখন বসে আছি শতমুখীর চরে। সময় ঠিক সন্ধ্যা ছ টা। চরাটার ঠিক পাশ দিয়ে রোজের নিয়মে বয়ে চলেছে গঙ্গা। ঘরে ফেরা পাখীদের কিচির মিচিড়ে কান পাতা দায়। পশ্চিমের আকাশে নানা রঙের খেলা। বিদায়ী সূর্য আজকের মত বিদায় নিচ্ছে। একটু একটু করে আঁধার নামবে পৃথিবীর বুকে। আঁধার নামবে এই শতমুখীর চরা তেও। তবে এখন আর অন্ধকার তেমন ঘন নিকষ কালো হয়ে গ্রাস করে না শতমুখী কে, যেমনটা আজ থেকে সায়ত্রিশ আটত্রিশ বছর আগে করতো। সেই সময়ে যারা শতমুখীর রূপ দেখেছে, তারা মেলাতেই পারবে না আজকের শতমুখী কে। সেই সময় এই চরা ছিলো একেবারে জনমানবহীন, সুনসান। শুধুমাত্র নিয়ম করে গঙ্গা দিনে দুবার করে এসে ভাসিয়ে দিয়ে যেত সেই চরাকে। আর সারাদিন সারারাত ধরে শতমুখী আঁচল বিছিয়ে অপেক্ষায় থাকতো বেয়ারিস লাশের। আসলে সেই সময় বেয়ারিস লাশ (যেমন ট্রেনে কাটা পরা অজ্ঞাতনামা দেহ) পুঁতে ফেলা হতো এই শতমুখীর চরাতে।
বর্তমানে বিজলি আলোর উপস্হিতি শতমুখীকে অন্ধকারে ডুব দিতে দেয় না সূর্য পাটে যাবার পরেও। 
তাছাড়া নগর সভ্যতা বিকাশের প্রভাব পড়েছে গ্রামে গঞ্জেও। এখন আর আগের মত নিরিবিলি একাকিনী নয় 
শতমুখীর চরা।

এত টুকু শুনে বন্ধুরা নিশ্চই ভাবছো, আমার তো এই উনচল্লিশ বছর বয়স। আটত্রিশ বছর আগে তখন আমি মাত্র এক বছরের। আমার পক্ষে কি করে সম্ভব এক বছর বয়সের স্মৃতি মনে ধরে রাখা? আসল বিষয়টা হলো চরা নিয়ে আমার এই অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ ভাবে নয়। বলা ভালো পরোক্ষ ভাবে।
 সেই সময়কার এক নিশুতি রাতে শতমুখীর চরার  গা ছমছমে অনুভুতির গল্প আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা। আজ আমি তোমাদের সেই গল্পটা শোনাতে চাই, যেটা বন্ধু আমায় বলেছিলো।

আজ থেকে আটত্রিশ বছর আগে আমার সেই বুড়ো বন্ধুর বয়স তখন বছর ষোলো। নাম মুন্না (আমি বুড়ো ডাকি)। সবে মাধ্যমিক শেষ করে সেই বন্ধু মামাবাড়ি যায় ছুটি কাটাতে।
বন্ধু তখন কলকাতায় থাকতো। মামাবাড়ি উলুবেরিয়া তে, গঙ্গার এক্কেবারে ধারে। উলুবেরিয়া তখন এক গ্রাম।উলুবেরিয়াতে গঙ্গার ধারে মামাবাড়ির সেই গ্রাম থেকে শ্মশান (200 মিটার) হাঁটা পথে মিনিট পাঁচেকের ও কম পথ। আমার সেই বন্ধু মুন্নাদা আর তার মামাতো ভাই রাজু সেই রাতে, রাতের খাবার খেয়ে এক ঘরে শুয়ে।  রাত তখন এগারো টা কি সাড়ে এগারো টা। হঠাৎ লোডশেডিং। দুই কিশোর বয়সী ভাইয়ের মাথায় হঠাৎ ঝোঁক চাপে এই রাতের বেলায় তারা সেই শ্মশানে যাবে ভুত দেখতে। আজ থেকে আটত্রিশ বছর আগের এক গ্রামের রাত এগারোটার গভীরতা কিন্তু আজকের থেকে অনেক অনেক বেশী গভীর।

তা দুই ভাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটা লাগলো সেই পথে, ঠিক যেই দিকটায় শ্মশান। চাঁদের আলোয় ভাসছে তখন সমস্ত বিশ্ব চরাচর। যেন একটুকরো স্বর্গ নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে। তাদের চলার পথের এক পাশে আপন ছন্দে বয়ে চলেছে গঙ্গা। সুন্দরী গঙ্গা তাদের আগলে রেখে, চাঁদের আলো পথ দেখিয়ে তাদের নিয়ে চললো শ্মশানের ঠিক কাছটায়। দুই ভাই নদীর ধারের মেঠো পথটা ছেড়ে নেমে পড়লো শ্মশানের দিকটায়। শ্মশানের এক পাশে এক প্রকান্ড বট গাছ। দুই ভাই সেই বট গাছের নীচের বেদীতে জড়োসড়ো হয়ে চুপচাপ করে বসে ভুত আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে লাগলো।
সেই সময় বা তার বেশ কিছু ঘন্টা আগেও কোনো মৃতদেহ দাহ করা হয়নি, কাজেই সেই শ্মশান তখন একেবারে অন্ধকার আর নিরিবিলি।  সময়ের মনে সময় যায়, অথচ ভুতের দেখা নাই। মশার একটানা গান আর কামড়ে দুই ভাইয়ের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙলো। কিন্তু এতে তারা আরো বেশি অসহিষ্ণু ও দুঃসাহসী হয়ে উঠলো। ঠিক করলো শ্মশান ছাড়িয়ে এগিয়ে যাবে ওই চরার কাছটায়। হ্যাঁ ওটাই সেই শতমুখীর চরা। যেই চরা জোয়ারের সময় গঙ্গার জলে ডুবে যায় আবার ভাঁটার টানে জল নেমে গেলে চরা জেগে ওঠে। যেই চরার জলা জমিতেই পোঁতা হয় বেয়ারিস লাস। 
দুই ভাই শ্মশান ছাড়িয়ে চরার ধার টায় এসে অপেক্ষা করতে লাগলো সেই মহেন্দ্রক্ষনের। পার্থীব ও অপার্থিব জগতের সীমারেখা  মুছে যায় যেই ক্ষণে। অশরীরি শরীর এসে বোধ হয় ধরা দিতে যায় রক্ত মাংসে গড়া মনুষ্য চোখে। সেই ক্ষণের সন্ধানেই তো আজ দুই ভাই ঘর ছেড়ে মাঝ রাতে গঙ্গা বক্ষে এই শতমুখীর চরায়।

চাঁদের আলোয় গঙ্গার রূপ যেন স্বর্গের কোনো মোহময়ী রূপসী অপ্সরার থেকে কম কিছু নয় সেই রাতে। নদীতে তখন ভরা জোয়ার। জোয়ারের জল এসে ভেঙে পড়ছে শতমুখীর চরায়।
নদীর ওপার থেকেও যেন ভেসে আসছে বান আছড়ে ভাঙার প্রবল গর্জন।

এক অদ্ভুত ভালোলাগা মিশ্রিত অস্বস্তি ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলছে কিশোর মুন্নার অবচেতন মন।
কিশোর মুন্নার একে একে মনে পড়তে থাকে মায়ের কাছে শোনা নানা গল্প। ছোটবেলায় মায়ের কাছে শুনেছিলো একবার না দু দুবার তার নানীকে না কি নিশুতি রাতে  নিশি ডাক দিয়েছিলো। নানীকে দুইবার ই উদ্ধার করা হয়েছিলো কাকভোরে অচৈতন্য অবস্থায় সদর দরজার সামনে থেকে। কোনো কারণে নানী হয়তো সদর দরজার আগল খুলতে পারেনি, নইলে নিশি হাতছানি দিয়ে যে নানী কে কোথায় নিয়ে যেতো,তা কল্পনা করে মনে মনে শিউরে ওঠে কিশোর মুন্না। 

তবে কি আজ এই নিশুতি রাতে তারা দুই ভাই যে শতমুখীর চরায় দাঁড়িয়ে প্রহর গুনছে, তা কি তবে সেই নিশিডাকের ছলনাতে সাড়া দিয়েই?

এর পরে মনে ভেসে ওঠে ছোটবেলায় নানীর কাছে শোনা বিবির চরার গল্প। সেই বিবির চরার গল্পও কিন্তু কম রোমহর্ষক নয়। বিবির চরায় বান এলে না কি কোনো বাচ্চার একটানা কান্নার আওয়ায় শোনা যেত।

তবে?
তবে এখুনি কি কোনো বাচ্চা কেঁদে উঠবে?
মনে মনে প্রমাদ গোনে সে।

এমন সময় চাঁদের আলোয় দূরে অস্পষ্ট দেখা যায় দুটো কুকুরকে লাফালাফি করতে শতমুখীর চরার সেই জলা জমিতে। আরেকটু এগিয়ে যায় তারা, বিষয়টাএকটু ভালো ভাবে বুঝবার জন্য।
উফফফ!!!!
এ কি??
 এ তো একটা মৃতদেহ। কুকুর দুটো তাদের হাত পা মুখ দিয়ে সেটাকে টেনে বার করবার অদম্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চরার জলা জমি থেকে।

এই দৃশ্য দেখে দুই ভাইয়ের সম্বিৎ ফেরে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে তারা হনহন করে রওনা দেয় বাড়ির পথে। দ্রুত পায়ে তারা পৌঁছতে চায় চরা ছাড়িয়ে শ্মশানের সেই বেদীটায়, তারপর শ্মশান ছাড়িয়ে নদীর ধারের সেই রাস্তাটায়। 
এক সময় সেই রাস্তায় উঠে পরে দুই ভাই। এখনো পাঁচ মিনিটের পথ মামা বাড়ির গ্রাম।সেই পাঁচ মিনিটের পথ যেন এক সহস্র যোজন দূরে। 
ভয়ে যেন তাদের চলবার শক্তিও কম হয়ে এসেছে। তবুও থামলে চলবে না।
হঠাৎ করেই দুই ভাই জাপটে জড়িয়ে ধরে নিজেদের। 
তারা দেখে অন্ধকারে পথের মধ্যে আলুথালু বেশে এক মানুষ। মানুষ না কি এটা সেইইইইইই ছায়া?

নিজেদের সামলে নিয়ে তারা উদ্ধার করে এ এক মাতাল। মুখ দিয়ে ভরভর করে গন্ধ বেরোচ্ছে দেশী চুল্লুর। তবে এই মাতালকে রাজু আগে কোনোদিন ও দেখেনি। তখনকার দিনে গ্রামাঞ্চলে সবাই সবাইকে চিনত। কিন্তু মাঝ বয়সী এই মাতাল এই তল্লাটে একেবারেই নতুন মুখ।
একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল রাজু নিজেকে একটু ধাতস্থ করতে একটা বিড়ি চেয়ে বসলো সেই মাতালের থেকে।

 মাতাল তখন দুই ভাইয়ের চোখের দিকে কড়া চোখ রেখে, চোখ গোল গোল করে, দৃঢ় কন্ঠে, গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো, "কাজটা ঠিক করলে তো?"

এরপর আকাশ বাতাসকে চিরে ফালাফালা করে মাতালের সে কি এক প্রকান্ড অট্টহাসি।

দুই ভাই পড়িমরি করে, উর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগলো বাড়ির দিকে, নিভৃত আশ্রয়ের খোঁজে। আর সাহস করলো না পিছনে ফিরে তাকাবার।

এই ঘটনার পরে সময় অনেক গড়িয়েছে।
গঙ্গার ওপর দিয়ে খেলে গেছে কত জোয়ার, কত ভাঁটা।
কত ঘটনার সাক্ষী নিয়ে গঙ্গাবুকে আজো জেগে বসে আছে শতমুখী।
সেদিনের কিশোর মুন্নাও আজ একজন পৌঢ়। 
তার কাছেই শুনেছি সেই ঘটনার অনেক বছর পরে তিনি শতমুখীর চরায় ঘুরতে গিয়ে একবার এক নরকঙ্কালের খুলির ছবি তুলেছিলেন। অনুরোধ রাখবো তিনি যদি সেই ছবিটি এই লেখার সাথে জুরে দেন, তবে আমার লেখাটি পরিপূর্ণতা পায়।

মুন্নাদা র কাছে আরো শুনেছি, মাতালের সেই রাতের সেই ছোট্ট কথা টা দীর্ঘদিন, দীর্ঘ সময় তাড়া করে বেরিয়েছে তাকে। অনেক স্বস্তির মুহূর্ত অস্বস্তিতে ভরে উঠতো মাতালের সেই কথাটা মনে করে।
 এমনকি আজও, প্রায় চল্লিশ বছর পরেও তার অবচেতন মনকে নাড়া দিয়ে যায় মাতালের সেদিনের সেই ছোট্ট কথাটা।

"কাজটা ঠিক করলে তো?"



Post a Comment

0 Comments