কিছুদিন একঘেয়ে বাড়ীতে থাকলেই যাযাবর এই মনটা আমার অস্থির হয়ে ওঠে,কোথায় যাই কোথায় যাই,কবে যাই কবে যাই। মন যখন এমন উচাটন,সুযোগ তো আসবেই। এমনই হঠাৎ জানা গেল,৪দিন পরপর ছুটি। চল তবে বেরিয়ে পড়ি। উঠল বাই তো কটক যাই। না কটক নয়,ওই আর কি,কটকের কাছাকাছি, পুরী। ২৭বছর আগে পুরী গিয়েছিলাম,তার আগে হানিমুনে ১৯৮৪তে। অনেক মধুর স্মৃতি জড়িয়ে পুরীতে। যাব যাব করে যাওয়া হয় না,তাই গিন্নীকে খুশী করতেই কর্তামশায়ের এই ব্যবস্থা।
বাই উঠলেই তো আর হবে না,যাওয়া কি আর মুখের কথা? ট্রেনের টিকিটই তো পাওয়া যায় না,তাই কাটা হল ওয়েটিং লিস্টে পরিচিত একজনের ভরসায়।এরপর হোটেল,সব booked,sold out. কিন্তু বাই যখন উঠেছে,কিছু তো একটা করতেই হবে। তা আমার কর্তামশায়ের এক ক্লায়েন্টের ওড়িশায় মাছের বিশাল ব্যবসা,শুনে তিনি আশ্বাস দিলেন,"স্যার আসতে চেয়েছেন,ব্যবস্থা আমি করে দেবই,কোনো চিন্তা নেবেন না,চিন্তা আমার"। স্যারের একটাই বক্তব্য,"ম্যাডাম কিন্তু বেশি হাটতে পারেন না,সি-ফেসিং রুম চাই,ঘর থেকে সমুদ্র দেখবো আমরা"।"ঠিক আছে স্যার ম্যাডাম বেডে শুয়ে সমুদ্র দেখবেন,তেমন হোটেলই ব্যবস্থা করে দেবো "।
যাবার ক'দিন আগে হোটেল বুকিং হল,তিনি নেট খুলে হোটেলের ছবি দেখালেন,বেশ সুসজ্জিত,পছন্দ হল বেশ।আমি আবার থাকার ব্যাপারে একটু খুঁতখুঁতে,খাওয়া যা হয় খেয়ে থাকতে পারি কিন্তু যেখানেসেখানে থাকতে পারি না। এ তো গেল হোটেলের ব্যাপার কিন্তু ওয়েটিং লিস্টের টিকিট তো লাস্ট মোমেন্টে চার্ট প্রিপেয়ারের আগে কনফার্ম হবে। যিনি টিকিটের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি সেদিনই হঠাৎ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ায়,ব্যাপারটা ফলোআপ করতে না পারায় চার্টে আমার নাম নেই। তখন কি করা যায়,এত কান্ড করে সব ব্যবস্থা করা হল,যাবো না? উঠে তো পড়লাম ট্রেনে,যা হয় দেখা যাবে। এই ৪দিনের ছুটিতে বোধহয় সবাই পুরী যাচ্ছিল,সামনে জন্মাষ্টমী,পুরীর সব ট্রেন ফুল,ওভার ক্রাউডেড। তার ওপর হল কি ট্রেনে তো সবাই উঠে বসলাম,এসি চলে না,সবাই বলাবলি করতে লাগল পাওয়ার সেভিং হচ্ছে,এদিকে আমাদের প্রাণ যে ওষ্ঠাগত প্রায়। ভাবল সবাই ট্রেন ছাড়লে বুঝি এসি চলবে,ওমা প্রায় আধঘন্টা হয়ে গেল গাড়ি ছেড়েছে,সবাই ঘামতে শুরু করেছে,এসির কোনো নামগন্ধ নেই। এভাবে আর কিছুক্ষণ চললে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়বে। এবার সব ক্ষেপে উঠল,আর কতক্ষণ ধৈর্য ধরা যায়? হৈ হৈ শুরু হয়ে গেল,টিটিকে ধরল সবাই,তিনি টেকনিশিয়ান দেখিয়ে কেটে পড়লেন। ভেস্টিবিউল পেরিয়ে টেকনিসিয়ানকে গিয়ে ধরল কয়েকজন,তারও আধঘন্টা পর এসি চলল। ততক্ষণে সবাই হাঁপিয়ে উঠেছে, ব্যাগে একটা ফোল্ডিং চাইনিজ পাখা রাখা থাকে,সেটা দিয়ে আরাম পাবার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে গেলাম ততক্ষণ। এরপর কম্পার্টমেন্ট ঠান্ডা হলে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া লুচি,আলুরদমের সদগতি করে শোবার ব্যবস্থা,কিন্তু শোবো কোথায়, আমার তো বার্থ নেই। আমার কর্তা রিজার্ভেশন কনফার্ম ছাড়া ট্রেনে ওঠেন না কখনও,এবারই সেই পরিচিতের আশ্বাস বানীতে উঠলেন আর এবারেই সব বেহাল হয়ে গেল। তিনি তো গজরগজর করে যাচ্ছেন,স্বগতোক্তি করছেন,"এইজন্যে আমি রিজার্ভেশন করে ছটফট করি,এখন বুঝছ তো কেন?" অতঃপর যা জীবনে কস্মিনকালে হয় নি,এক বার্থে দু'জনে উল্টো দিকে মুখ করে সরু হয়ে(যদিও আমি তো কতটা সরু হলাম জানিনা, নেহাত তিনি রোগাসোগা মানুষ তাই)আমি ধারের দিকে শুলাম। সে কি ঘুম হয়? তিনি একটি ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুলেন,আমি তাই ধারে গার্ড দিয়ে শুলাম। তিনি ঠিক থাকলে তবেই তো আমায় ঘোরাবেন,তাই না? সারা রাতই জেগে,পায়ে ব্যথা,কোমরে ব্যথা,কুঁজোর চিৎ হয়ে শোয়ার ইচ্ছে আর কি। বেকার হয়ে গেছি এক্কেবারে। মনে কত সাধ ক্ষমতায় কুলোয় না,তবে আমাদের মত অবস্থা ট্রেনে অনেকের, একজন ঘুমাচ্ছে তো পায়ের কাছে একজন হেলান দিয়ে বসে ঘুমাবার বৃথা চেষ্টা। নিচে খবরের কাগজ বিছিয়ে শুয়ে পড়েছে কেউ কেউ,আহা রে কি দুরবস্থা,বাড়িতে এনারাই সব খাট-পালঙ্কে ঘুমান। এক পা ফেলার জায়গা নেই, টয়লেটেও যাবার উপায় নেই। রাগ হল দেখে,বাচ্চা মেয়ের বার্থে বিশাল বপুওলা এক বাবা শুয়ে অকাতরে এমন ঘুমাচ্ছে চিৎপটাং হয়ে যে ৭-৮বছরের বাচ্চা মেয়ে আর চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে শুয়ে থাকতে না পেরে উঠে বসে হেলান দিয়ে কাটিয়ে দিল সারারাত। বাবার কিন্তু বিকার নেই, নাসিকাগর্জনে সুখনিদ্রাই তার প্রমাণ। যতবার দেখি চোখখুলে,মেয়েটি জেগে বসে। আহারে বড্ড কষ্ট হল মেয়েটির জন্য।
ট্রেনে তখন কেউ আর পুরোপুরি জেগে নেই,আমিও চোখ বুজছি,খুলছি, একসময় চোখ খুলে দেখি কিছু দূরে সাইড লোয়ার বার্থে এক নবদম্পতিই হবে সিঁদুরের বাড়াবাড়ি দেখে মনে হল,আমাদের মত এক বার্থে,তবে মুখোমুখি শুয়েছে তারা,দুজনে দুজনকে জড়িয়ে অধরসুধা পান করে চলেছে,কেউ দেখল না ভেবে। দেখেই চোখ বুজে নিয়েছি যদি দেখে লজ্জা পায় ভেবে আর খুব মজা লাগল দেখে,আহা এমনদিন তো আমাদেরও ছিল একদিন। চোখ বুজে নিজের অতীতে চলে গেছি,কত কত মিষ্টি মধুর স্মৃতিরা উঁকি দিতে লাগল। সেই ৩৪বছর আগের হানিমুনের স্মৃতিও তখন টাটকা হয়ে ধরা দিল। সুখস্মৃতিতে ডুব দিয়ে কখন যেন চোখটা একটু লেগে গিয়েছিল,পা-টা বার্থ থেকে ঝুলে পড়তেই চোখটা খুলে গেল। সেই একই দৃশ্য চারিদিকে,সেই বাবাও ভোঁসভোঁস করে ঘুমাচ্ছে,মেয়েটি ঠেসান দিয়ে বসে,চোখে তার ঘুম নেই ,তাকাচ্ছে চারিদিকে,আমার সাথে চোখাচোখি হতে হাসল একটু, আমিও হাসি ফিরিয়ে দিলাম। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি অন্ধকারের ঘোর কেটেছে। আস্তে আস্তে আলো হচ্ছে আকাশ,দিনমণি বুঝি পাশ ফিরে আড়মোড়া ভাঙছেন,মেঘের ফাঁক থেকে বুঝি এখুনি দেবেন উঁকি। কামরার ভেতর আস্তে আস্তে মানুষের চলাচল শুরু হল।আর কিছুক্ষণের মধ্যে স্টেশনে ঢুকবে ট্রেন,গোছগাছ চলছে,সবাই তৎপর। কর্তাকে উঠিয়ে আমরাও নামার জন্য তৈরি। দেখা যাচ্ছে প্ল্যাটফর্ম,চা-য়ে করে চা-ওয়ালার হাঁক শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। ট্রেনের কামরার একটা রাতের কত ঘটনার সাক্ষী হয়ে পা দিলাম পুরী স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। পুরীর আকাশে তখন তরুণ তপন তার লালিমা ছড়িয়ে ঝলমল করছে,তার সাথে মিষ্টি মিষ্টি ভোরের হাওয়ায়,দূর থেকে সমুদ্রের ডাক শুনে মন ভাল হয়ে গেল,রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি হয়ে গেল উধাও। এগিয়ে চললাম হোটেলের পথে।
Collected

0 Comments