#আমারবিরিয়ানি-#বিরিয়ানিরআমি
১৮৫৬ সালে অযোধ্যার শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ ব্রিটিশদের অনুরোধে কোলকাতা আসেন। তাঁর বাবুর্চিদের হাত ধরেই কোলকাতায় আগমণ বিরিয়ানির। এই লখনউ বিরিয়ানির সাথে কিছু নিজেদের মতো মশলা আর আলু যুক্ত করে জন্ম হয় আমাদের কলকাতা বিরিয়ানির।
তবে এই জন্মের বহু বছর পরে ২০০৪-০৫ সাল নাগাদ cheap & best নামে এক দোকানের হাত ধরে বিরিয়ানির পদার্পন ঘটে আমার শহর বর্ধমানে। চারদিকে বেশ শোরগোল, স্কুলে বন্ধুদের কাছে শুনে আমিও মায়ের কাছে আবদার জানালাম। সে দাবি মা রাখলো, সেটাই আমার জীবনে প্রথম বিরিয়ানি খাওয়া- হাফ চিকেন বিরিয়ানি -৩০ টাকা আর চিকেন চাপ-১৫ টাকা। প্রথম দেখায় (চাখায়) ভালোবাসা বলে যে কিছু হয় সেটা আমি সেদিন বুঝেছি। আবার আবদার করলেই মা বলতো পরীক্ষা শেষ হলে যাবি। কিন্তু সে তো ঢের দেরী, কী করি কী করি করে, টিফিনের জন্য বরাদ্দ ২ টাকা থেকে ১ মাসের মধ্যে ৩০ টাকা জমিয়ে একদিন স্কুল থেকে লুকিয়ে বেরোলাম বিরিয়ানি খেতে। সে এক যুদ্ধ জয়ের আনন্দ! বিরিয়ানি খেয়ে বাকি ক্লাস শেষ করে উৎফুল্ল হয়ে বাড়ি ঢুকতেই আমার ওপর ঘটে গেল surgical strike... কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাতা, খুন্তি, বেলনা দিয়ে আপাদমস্তক ঠেঙিয়ে দিলো মা।😢 কথায় বলে পেটে খেলে পিঠে সয়, তাই হলো। পরে জানলাম কোনো এক শুভচিন্তাক ব্যক্তি মা কে ল্যান্ড ফোনে কল করে বলে, আপনার ছেলে স্কুল থেকে পালিয়ে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর কে দেখে!! টাকা জমিয়ে বিরিয়ানি খাওয়ার সাহস আর হয়ে ওঠেনি।
২০১০ সালে যাদবপুরে পড়তে আসার পর কেটে যায় সব ভীতি, শুরু হয় খুল্লামখুল্লা বিরিয়ানিপ্রেম। বর্ধমানে থাকতে যে দুটি রেস্টুরেন্টের নাম আমি জেনে এসেছিলাম তারা হলো আরসালান আর রয়্যাল। আরসালান সেসময় কলকাতার বিরিয়ানি রাজ্যত্ব শাসন করছে। প্রথম গেলাম সেখানেই, বেশ বড় মাংসর পিস সাথে আরো বড়ো আলু, গন্ধে পুরো ম ম করছে। প্রথমবার কলকাতায় বসে কলকাতা বিরিয়ানি খাওয়ার স্বাদ আজও লিখতে গিয়ে জিভে জল আনছে।
এবার গেলাম চিৎপুর বিজয়ী রয়্যাল ইন্ডিয়া হোটেলে, তাঁরা বিরিয়ানিতে আলু দেননা শুনে একটু আশাহত হলাম।😒 আলুর খোঁজ করায় উত্তর দিয়েছিলেন, " আমরা বিরিয়ানি বানাই, খিচুরি নয় যে আলু দেবো।" আলুর পরিবর্তে তাঁরা কিছু মাংসের বল বা মতি দেন। তবে এই আলুর দুঃখটা ভুলিয়ে দিয়েছিল মাটন চাঁপ, গ্রেভির স্বাদ অকল্পনীয়। আরও বেশ কিছু রেস্টুরেন্টে যেমন জিশান, সিরাজ, আমিনিয়ার মতো রথীমহারথীদের বিরিয়ানি খেয়ে দেখি। এ যেনো প্রেমিকাকে আলাদা আলাদা সাজে দেখার আনন্দ।
কলেজে পড়ি, তাই necessity আর luxury র মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতেই পারছেন। আমার কাছে বিরিয়ানির ব্যাপারে necessity বলতে ছিল লাল সালু মোড়া বিভিন্ন নামের যোদ্ধারা- হাজী,সুপার হাজী, সুপারস্টার হাজী, নিউ আরসালান, রতনদা আরো নাম না জানা কত কে। যাদবপুরে কৃষ্ণাগ্লাসের কাছে ছিল হাজী বিরিয়ানি, ৬০ টাকায় ডিম, আলু, স্যালাড সহযোগে যা পরিবেশন করতো তাকে value for money বললেও মনে হয় কম বলা হয়। এভাবেই necessity আর luxury দুই নিয়েই এগিয়ে চললো আমার ভালোবাসা।
চাকরিতে ঢোকার পর প্রথম মাসের বেতন একাউন্টে ঢুকতেই দৌড় দিয়েছিলাম চিনারপার্ক আমিনিয়াতে। তারপর সারা কলকাতা জুড়ে শুধুই ভালোবাসা খুঁজে বেড়ানো- আরসালান,আমিনিয়া, রিয়াজ, আউদ ১৫৯০, শাবির, সিরাজ, দাদাবৌদি, ইন্ডিয়া, কাবুলিওয়ালা, দাওয়াত, জমজম, আলিয়া, রহমানিয়া, মটকা আরো কতো নাম। সেরকমই একটা নাম নিউ আরসালান বিরিয়ানি। কাকার দোকানে বিরিয়ানি ৭০ টাকা প্লেট, তাই নাম দিয়েছি কাকা৭০। আমার দৌলতে অফিসের সহকর্মীরা কাকার বিরিয়ানির নিয়মিত খদ্দের। নিজের দিনে ইনি স্বাদে কলকাতার অনেক মহারথীর সঙ্গেই পাল্লা দিতে পারেন।
আমি আজও ভাবি সুগন্ধী চাল, মাংস,আলু আর তার সাথে ঘি, মিঠা আতর এর হালকা গন্ধে কি যে স্বর্গসুখ আছে! সুখা কাট আর গিলাকাট মিশিয়ে যে বিরিয়ানিটা প্লেটে আসে ওটা আমায় তুরীয় আনন্দ দেয়, বিরিয়ানির সাথে সর্বাঙ্গে প্রেমটা বেশ জমে ওঠে।
এই লকডাউনে ঘরে বেশ কিছু রেসিপি নিজে চেষ্টা করে বেশ খাসা একটা বিরিয়ানি বানাতে সক্ষম হয়েছি। একদম যাকে বলে উমদা! সাথে একটু রাইতা হলে আর কথাই নেই। এ আমার জীবনের এক অনবদ্য সাফল্য।
এত বছর ধরে সব মুহূর্তেই পাশে থেকেছেন ইনি, সে মানসিক অবসাদ হোক বা অনাবিল আনন্দের মুহূর্ত, প্রেমিকার সাথে ঝগড়া বা তার মানভঞ্জন, বন্ধুদের সাথে আড্ডা বা একাকীত্বে। তাই ১০০ & above এর এই গান,
"প্রেমে পড়ে পেলি ধোকা,
অফিসেতে খেলি বকা।
রাত জেগে তারা গোনা,
কোন দুধে কত সোনা।
এই দ্বিধা দ্বন্দেতে তাল কাটা ছন্দেতে, একটাই কথা শুধু জানি-
সকলই সইতে পারি এবোঝা বইতে পারি সঙ্গে থাকলে বিরিয়ানি।"
- 'Biryani is not just food, it's an emotion'.
Happiness is Biryani.❤
শেষে কয়েকটা কথা, আমি বিরিয়ানি বলতে মাটন বিরিয়ানি বুঝি, মাটন শেষ হয়ে গেলে তবেই চিকেন বিরিয়ানি মুখে তোলা উচিত। আর ভেজ বিরিয়ানি বলে কোনো খাবারের অস্তিত্ব আমার দুনিয়াতে নেই। 😜
🖋️অনুপম



0 Comments