লক্ষ্য যখন লাক্ষাদ্বীপ

(১ম পর্ব)
    বেশ কিছুদিন ধরেই লিখব লিখব করে হয়ে উঠছিল না।এই লকডাউনে গৃহবন্দী হয়ে অবশেষে পুরোনো স্মৃতির ঝাঁপি খুলে ফেললাম।স্মৃতির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ফিরে গেলাম সেই স্বপ্নময় রূপকথার দিনগুলোতে।
     আজ এক সুন্দরী লাজুক রমণীর গল্প শোনাব। সে নিজেকে আড়ালে লুকিয়ে রাখে কিন্তু তার রূপের ছটায় মুগ্ধ হয়ে আমরা তার প্রেমে পড়ে গেছিলাম।ভাবছেন তো কার কথা বলছি? বলছি  স্বপ্নসুন্দরী লাক্ষাদ্বীপ এর কথা।
    লাক্ষাদ্বীপ ভ্রমণ সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই এক মন খারাপ করা করুণ অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের জানাতে হয়। এই  ঘটনাটার কথা না বললে আমাদের লাক্ষাদ্বীপ ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।কত বাধা বিপত্তি কাটিয়ে সুন্দরীর দর্শন লাভ করেছিলাম সেটাই আগে বলি। আমাদের দশজনের 'পরিযায়ী' নামে একটা গ্রুপ আছে।আর সারা বছরই সেই গ্রুপের ছোট বড় মিলিয়ে তিন চারটে ট্যুর হয়েই থাকে।তেমনি এই স্বপ্নের সফর নিয়ে বিগত এক বছর ধরে নানা পরিকল্পনা করে একটু একটু করে সব কাজ গুছিয়ে নিয়ে গত 9th নভেম্বর 2019 যাত্রার দিন ঠিক হয়।যত দিন এগিয়ে আসতে থাকে সবার মনে একটা আনন্দ  উন্মাদনা অনুভূত হতে থাকে।সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করে যখন আমরা স্বপ্নপুরীতে যাব বলে প্রস্তুত তখনই এলো সেই দুঃসংবাদ।
     8th নভেম্বর রাত নটার সময় ইন্ডিগো এয়ারলাইন্স msg পাঠিয়ে জানায় 9th নভেম্বর দুপুর 2.30মি. কলকাতা থেকে কোচির ফ্লাইট ক্যান্সেল কারণ বঙ্গে সাইক্লোন 'বুলবুল' আছড়ে পড়তে চলেছে।মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।লাক্ষাদ্বীপ ট্যুরিজমে ফুল পেমেন্ট হয়ে গেছে  আর সবার নামে পারমিট ইস্যু হয়ে গেছে।এখন আমরা কি করব? কিন্ত তখনো পর্যন্ত আমরা আঁচ করে উঠতে পারিনি এই বিপর্যয় কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে আমাদের জন্য।সারারাত কেউ দু চোখের পাতা এক করে উঠতে পারেনি।চারটে পরিবার ফোনের মাধ্যমে পরস্পর যোগাযোগ রেখে স্থির করলাম ভোরের আলো ফোটার আগেই  আমরা এয়ারপোর্ট পৌঁছে যাব।তারপর দেখা যাক অন্য কোন ফ্লাইটের টিকিটের ব্যবস্থা করে যদি কোনভাবে কোচি পৌঁছতে পারি।কারণ পরদিন 10th নভেম্বর সকাল আটটায় কোচি থেকে আমাদের লাক্ষাদ্বীপ এর ফ্লাইট।তাই যেভাবেই হোক 9th নভেম্বর রাতের মধ্যেই আমাদের কোচি পৌঁছতে হবে।
      9th নভেম্বর ভোর পাঁচটার মধ্যেই আমরা এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেলাম।চেক ইন করে ইন্ডিগো কাউন্টারে গিয়ে  বিভিন্ন ভাবে  ঘুরপথে কোচি পৌঁছনোর চেষ্টা করতে লাগলাম।কিন্তু বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও  কোন টিকিটের ব্যবস্থা করা গেল না।দশজন বলে আরো একটা সমস্যা হচ্ছিল।কোন ফ্লাইটে হয়ত চার পাঁচটা টিকিট পাচ্ছি কিন্ত সবার হচ্ছে না। কাউকে ছেড়ে যাবার কোন প্রশ্নই নেই।এভাবে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স এর কাউন্টারে  দৌড়ঝাঁপ করতে করতে বেলা দশটা নাগাদ অনেক টাকা গচ্চা দিয়ে এয়ার এশিয়ার দুপুর 3.30 মিনিটের কলকাতা থেকে চেন্নাই ফ্লাইটের টিকিট পেলাম।এরপর ইন্ডিগো এয়ারলাইন্স আমাদের  চেন্নাই থেকে ব্যাঙ্গালোর আর ব্যাঙ্গালোর থেকে কোচি এই দুটো ফ্লাইটের টিকিট আরেঞ্জ করে দিলেন।কোচির ফ্লাইট পৌঁছাবে সকাল ছটায়।ওনারা কোচির ইন্ডিগো কর্মীদের ফোনে জানিয়ে দিলেন সকাল আটটার  এয়ার ইন্ডিয়ার  উড়ান ধরার জন্য ওনারা যেন আমাদের সাহায্য করেন।কারণ দুটি উড়ানের মধ্যবর্তী সময়সীমা ছিল খুব কম।
     যাই হোক সবকিছু ঠিক করে সবাই একটু  নিশ্চিন্ত হয়ে খাওয়া দাওয়া সারলাম।সারারাত ঘুম নেই তাতে প্রচন্ড টেনশনে ক্লান্তিতে সবাই খুব কাহিল।তবুও সবার মনে একটা চাপা উত্তেজনা শেষমেশ যাওয়া তো হচ্ছে।কিন্তু ভাগ্যদেবী যে অলক্ষ্যে মুচকি হেসেছিলেন তা তো আমরা তখন বুঝিনি।
      এদিকে ক্রমশঃ দেখছি আকাশের অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠছে।প্রচন্ড বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইছে।কিন্ত তখনো ফ্লাইট ওঠানামা করছে।বোর্ডিং পাস নিয়ে সিকিউরিটি চেক করে ভেতরে ঢুকে গেলাম।মনের মধ্যে ক্ষীণ আশা যদি কোনরকমে একবার  ফ্লাইটে উঠে কলকাতা থেকে বেরিয়ে যেতে পারি তাহলে আর আমাদের পায় কে?
      এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট চেন্নাই থেকে একটু দেরিতে এসে নামল।আমরা বোর্ডিং পাস দেখিয়ে উড়ানের পেটে সেঁধিয়ে গেলাম।আস্তে আস্তে দিনের আলো নিভে গিয়ে অন্ধকার ঘনীভূত হচ্ছে।ভয় ক্রমশঃ চেপে ধরছে।কিছুক্ষণ পর পাইলট এনাউন্স করলেন দৃশ্যমানতা কম থাকার কারণে ফ্লাইট ছাড়তে একটু দেরি হবে।দুরু দুরু বক্ষে অপেক্ষা করছি কখন আমরা উড়ব?মিনিট পনেরো বসে থাকার পর আমাদের সব আশায় জল ঢেলে পাইলট ঘোষণা করলেন ফ্লাইট ক্যান্সেল।অত্যন্ত খারাপ আবহাওয়ার কারণে DGCA র নির্দেশ অনুযায়ী দুপুর তিনটে থেকে পরদিন সকাল ছটা পর্যন্ত কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে সমস্ত উড়ান বন্ধ করে দেওয়া হলো।এত দিনের  সব পরিকল্পনা আনন্দ এক নিমেষে শেষ হয়ে গেল।বুলবুলিতে ধান খেয়ে নিল আমরা কোনভাবেই পৌঁছতে পারলাম না।
     এরপরেও আর এক প্রস্থ কষ্টকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম আমরা।ইন্টারন্যাশনাল ও ডোমেস্টিক  সমস্ত প্যাসেঞ্জারদের লাউঞ্জ থেকে বাইরে বের করে দেওয়া হলো।তারপর শুরু হলো বিভিন্ন এয়ারলাইন্স এর কাউন্টার থেকে টিকিটের রিফান্ড ও রিসিডিউল এর কাজকর্ম।সে এক চরম  অব্যবস্থা।কাতারে কাতারে মানুষ বয়স্ক শিশু থেকে শুরু করে তীর্থের কাকের মত লাইনে অপেক্ষারত।কোন বসার জায়গা নেই, খাবার নেই।সে এক ভয়ংকর পরিস্থিতি।প্রায় তিন ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট রিফান্ড এর ব্যবস্থা করে ক্লান্ত বিধ্বস্ত আমরা ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে  ভারাক্রান্ত মনে বাড়ির পথ ধরলাম।
       ফ্লাইটে বসেই আমি ফোন করে লাক্ষাদ্বীপ ট্যুরিজমে সবকিছু জানিয়েছিলাম। পরের দিন থেকে আমরা কিছুদিন পর পরই পালা করে ফোন, মেল করতে লাগলাম।কিন্তু কোন রিপ্লাই পেলাম না।ফোন করলে বলে এখানে ওয়েদার ভালো ছিল আপনারা আসতে পারেননি তাই  কিছু করা যাবেনা।কিন্ত আমরাও হাল ছাড়িনি।মনের কোথাও একটা জোর ছিল এটা আমরা আদায় করে ছাড়বই।প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষের কোন হাত থাকে না।
       বহু মেল, ফোন করে বিফল হয়ে শেষমেশ আমরা লাক্ষাদ্বীপ ট্যুরিজমে স্পীড পোস্টে একটা চিঠি পাঠালাম।ইতিমধ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কোচি গিয়ে ওদের অফিসে দেখা করব।সামনাসামনি বসে যদি আমাদের সমস্যাটা ওদের বোঝাতে পারি তাহলে হয়তো একটা সমাধান মিলবে।আসলে ততদিনে আমরা ওদের অনেক টাকা(ফুল পেমেন্ট)দিয়ে দিয়েছিলাম ট্যুরিজমের নিয়মানুযায়ী।
       সেইমত9th ডিসেম্বর আমরা সাতজন টিম মেম্বার কলকাতা থেকে কোচি গিয়ে ওদের অফিসে দেখা করলাম।ওনারা আমাদের চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করলেন কিন্তু বললেন এটা কোনভাবেই সম্ভব নয় আর ওনারা এই ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।যদি কিছু করা সম্ভব হয় সেটা একমাত্র MD ই করতে পারবেন।তিনি আবার থাকেন কাবারাত্রিতে।আমরা সমস্ত রকম প্রমাণ দেখিয়ে নানাভাবে বোঝাতে চেষ্টা করতে লাগলাম।ভাষাগত একটা সমস্যা ছিল।ওনারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন আর আমরা তার মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।ভাবছি আমাদের পাত্তাই দিচ্ছে না।আর আমরাও কলকাতার হাড় হাভাতে বাঙালি মাটি কামড়ে পড়ে আছি।আমাদের একটাই বক্তব্য হয় রিসিডিউল করুন নাহলে রিফান্ড দিন।অগত্যা ওনারা MD র সাথে কথা বললেন।অবশেষে ঘন্টা দুয়েক বাদে আমাদের জানালেন রিফান্ড করা সম্ভব নয় ওনারা রিসিডিউল করবেন।আনন্দে আমরা চিৎকার করে উঠলাম।কলকাতা থেকে কোচি এতদূর খরচ করে সাতজনের যাওয়া অবশেষে সফল হলো।
     ওনারা কোনসময়ে গেলে আমাদের সুবিধা হবে জানতে চাইলেন।ডিসেম্বর ফুল বুক ছিল আর এই ফিনান্সিয়াল ইয়ার মার্চের মধ্যেই  ট্যুরটা করতে হবে।সকলের সুবিধা অসুবিধা দেখে আমরা ফেব্রুয়ারির আট তারিখে পুনর্বার যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম।ওনারা আগেই আমাদের ফ্লাইটের টিকিট কাটতে বললেন কারণ লাক্ষাদ্বীপে ছোট বিমান চলার জন্য অনেকসময় টিকিট পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে ওনারা ফারদার রিসিডিউল করবেন না।ওখানে বসেই আমরা কলকাতার বুকিং এজেন্টকে বলে তৎক্ষণাৎ টিকিট কাটার ব্যবস্থা করে ফেললাম।ওনারা আমাদের বুকিং কনফার্ম  করে ঘন্টা দুয়েক পরে আসতে বললেন রিসিডিউল পারমিট নেবার জন্য।প্রসঙ্গত বলি  লাক্ষাদ্বীপ ট্যুরিজম এর পারমিট ব্যতীত লাক্ষাদ্বীপে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ।
     সেদিন প্রায় সারাদিন ধরে ওনারা আমাদের অনেক উৎপাত সহ্য করেছেন।কিন্তু অসম্ভব ভদ্র বিনয়ী মানুষ ওনারা।কোনপ্রকার  বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখিনি হাসিমুখে আমাদের সাতজনের অত্যাচার সহ্য করেছিলেন।অবশেষে বিকাল চারটেয় নতুন পারমিট নিয়ে কুননুর, কুর্গ একটা ছোট্ট সফর করে আমরা কলকাতায় ফিরেছিলাম।
      এতক্ষণের এই বিরক্তিকর একঘেয়ে প্যানপ্যানানি হয়ত আপনাদের ভালো লাগবে না।কিন্তু এই করুণ অভিজ্ঞতার কথা না বললে লাক্ষাদ্বীপ ভ্রমণ অসমাপ্ত থেকে যাবে।কত কষ্ট করে এই সফর আমরা সম্পূর্ণ করেছিলাম সেটা অজানাই  রয়ে যাবে।পরের পর্বে আসছি লাক্ষাদ্বীপ কে সঙ্গে নিয়ে।


#Stay Home

Post a Comment

0 Comments