#বাইক ট্যুরে বেলপাহাড়ি
প্রথম পর্ব : খান্দারানী জলাধার
16 অক্টোবর 2019
******************************
পার্থ দা হঠাৎ একদিন কল করে বললো "মীর বাইক নিয়ে বেলপাহাড়ি, কাঁকড়াঝোড় যাবে?" আমি বললাম আমার তো স্কুটি l স্কুটি নিয়ে যাওয়া যাবে? পার্থ দা হেসে বললো "আরামসে"l বেলপাহাড়ি চিল্কিগড় আমি আগে একবার গিয়েছি তাই জায়গাটার প্রতি একটা আলাদা নেশা কাজ করে আমার l যদিও বেলপাহাড়ির তেমন কিছুই দেখা হয়নি আগের বার l তাই সুযোগ সামনে আসায় আমি কিছু না ভেবেই হ্যা করে দিলাম l যথারীতি 16অক্টোবর 2019 খুব সকালে আমি বাড়ি থেকে স্কুটি, একটা ব্যাগ (প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস আর পোশাক, জলের বোতল )নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম l পার্থ দা ও তার এক বন্ধু পাঁশকুড়া থেকে আরো ভোর ভোর বেরিয়েছে l
সকাল 7 টার দিকে মেদিনীপুর শহরের রাঙামাটি যাওয়ার ওভার ব্রিজের মুখে আমরা সাক্ষাৎ করলাম l আর শুরু হলো জার্নি l অক্টোবর মাস l সকাল টা বেশ শীতল শীতল ভাব l ধুলোবালি রাস্তায় তখনো থিতিয়ে l চারদিক একটা নির্মল ভাব বিরাজ করছে l গাড়ি ঘোরার উৎপাতও তখনো শুরু হয়নি ততটা l তাই মনের আনন্দে গাড়ি চালিয়ে চললাম l পার্থ দা আগে আগে আমি পিছু পিছু l মেদিনীপুর শহর শেষ হতেই পরিবেশ কেমন বদলে গেলো l লাল মোরাম মাটি চারদিকে l রাস্তার ধারে গাছের সারি, জঙ্গল l বাজার, জনপদ, জঙ্গল, আবার জনপদ এই ভাবেই চললাম l মাঝে এক জায়গায় দাঁড়ালাম l ডানদিকে জঙ্গল l আর বাম দিকে একটিই খাবারের দোকান l আমরা এরকমই একটা জায়গায় সকালের খাবার টা খেতে চেয়েছিলাম l পেয়েও গেলাম l দুজন মুড়ি, ঘুগনি, চপ আর কাঁচা লঙ্কা, স্যালাট দিয়ে সেরে ফেললাম ব্রেকফাস্ট l পার্থ দা ছেঁড়া পরোটা আর ঘুগনি খেলো l
তারপর সময় নষ্ট না করে আবার চেপে বসলাম বাইকে l একই মতো ঘন্টা খানেক বাইক চালিয়ে পৌঁছে গেলাম ধেঁড়ুয়া l সেখানে কাঁসাই নদীর ওপর একটা সুন্দর ব্রিজ l গাড়ি থামিয়ে ওপর থেকে নদীর কয়েকটা ছবি আর নিজেদের কয়েকটা ছবি তুললাম l নদীতে জল তেমন নেই l এখনো কাশবনে কিছু কাশ অবশিষ্ট থেকে থেকে গেছে l শরৎ যে শেষের মুখে তারই বার্তা দিতেই হয়তো এরূপ দৃশ্যের অবতারণা l যাইহোক সময় নষ্ট একদম করা যাবে না l আবার শুরু হলো পথ চলা l দুই ধারে জঙ্গল, সবুজ খেত, খেজুর গাছ, বিচিত্র লোকজনের পথ চলা, মাটির সুন্দর ঘর বাড়ি, বাজার পেরিয়ে ছুটতে ছুটতে দহিজুড়ি হয়ে পৌঁছে গেলাম বিনপুর l আমার থাকার আস্তানা এই বিনপুরে l ঘুরবো বেলপাহাড়ি কিন্তু থাকবো বিনপুরে, শুনে একটু কেমন লাগলো তাইতো? তবে বলে রাখি পার্থ দা এর পরিচিত এক ডাক্তারবাবু যিনি শিলদাতে থাকেন তাঁর একটা অনুষ্ঠান হল ও চেম্বার আছে এই বিনপুরে l
সেখানে আমাদের থাকা সুবিধা জনক হবে পকেটের দিক থেকেও ও বন্ধুত্ব রক্ষার্থেও l যাইহোক আমরা প্রায় সারে নটার দিকে পৌঁছে গেলাম ওখানে l তারপর একটা রুমে ব্যাগপত্র রেখে ফ্রেস হয়ে ডাক্তার বাবুর সাথে দেখা করে রওনা দিলাম বেলপাহাড়ির উদ্দেশ্যে l বিনপুর থেকে প্রথমে শিলদা যেতে হবে l রাস্তা মোটামুটি ভালোই l দুই ধারে তাল খেজুরের সারি l মাঠ ভরা ফসল l একটা আলাদা গন্ধ বাতাসে l মন কেমন ফুর ফুর করতে লাগলো অজানা কোনো আনন্দে l যেতে বাম দিকে শিলদা মিলিটারি ক্যাম্প দেখলাম l যেখানে মাওবাদী হামলা হয়েছিল l দেখেই কেমন যেন লোম খাড়া হয়ে এলো l এই জায়গা গুলো এক কালে মাওবাদীদের কব্জায় ছিল l শুনেছি কত খবর, ঘটনা, রোমহর্ষক কাহিনী l আজ সেখানে সত্যিই অনেক শান্তি l বেশ আছে মানুষগুলো ওখানে l আর ত্রাসে দিন কাটাতে হয়না l
এখনো অনেকে জিজ্ঞেস করে থাকেন যে এখন ঝাড়গ্রাম, বেলপাহাড়ি, শিলদা এগুলো কি ঘুরতে যাওয়া সেফ হবে? তাঁদের বলবো একদম সেফ l এখন মাওবাদীদের কোনো রকম ভয় নেই l পাহাড়, ঝর্ণা, জলাধার, জঙ্গল আর সবুজ মাঠ, সাধারণ মানুষের বিচিত্র জীবনপ্রণালী চাক্ষুস করতে দু একটা দিন সবুজ গন্ধে, লাল মাটির ধুলায়, শাল পিয়ালের সুঘ্রাণে কাটাতে তাই এখন বহু মানুষের পছন্দের ঠিকানা ঝাড়গ্রাম বেলপাহাড়ি l সেই টানে আজ আমরাও চলেছি l যদিও পার্থ দা বহু বার গিয়েছে বেলপাহাড়ি কাঁকড়াঝোড় l শিলদা থেকে একটা রাস্তা বাঁকুড়া, একটা লালগড় আর একটা চলে গেছে বেলপাহাড়ি l আমরা বেলপাহাড়ির পথ ধরলাম l প্রথমে কিছুটা রাস্তা একটু খারাপ l তারপর রাস্তা বেশ সুন্দর l এই রাস্তার ধারে সুবিস্তৃত মাঠ আর খেজুর গাছের ভিড় l রাস্তার ধারে ধারে জলাশয় আর তাতে গোলাপি শালুক ফুলের মেলা l খেজুর গাছ গুলোতে হাঁড়ি বেঁধে বেঁধে কেমন বাঁকা আকার ধারণ করেছে l কোনো খেজুর গাছে নতুন করে ছেঁটে হাঁড়ি বাঁধার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে l মাটি বেশ লাল l লাল মাটির দেশে পৌঁছে বেশ খুশি হলাম মনে মনে l বেলপাহাড়ি ছোট্ট শহর গোছের জায়গাl বাজার, দোকানপাট আছে l সেখানে আমরা একটা দোকানে চা খেলাম l তারপর বাচ্ছা দের জন্য বিস্কুটের প্যাকেট আর চকোলেট কিনে নিলাম l এই প্রসঙ্গে বলে রাখি আপনারা কেউ এসব জায়গায় ঘুরতে এলে এই প্রত্যন্ত এলাকার বাচ্চাদের জন্য চকোলেট বিস্কুট নিয়ে যাবেন l এতে ওরা খুব খুশি হয় l যাইহোক বেলপাহাড়ি বাজার ছেড়ে ছুটে চললাম সুন্দর পথ ধরে l কিছুটা যাওয়ার পর বেলপাহাড়ির আসল রূপ প্রতিভাত হতে লাগলো l সরু রাস্তা, আঁকা বাঁকা পথ, চারদিকে সবুজ আর সবুজ l ছোট ছোট সবুজ পাহাড় বেরিয়ে এলো l দেখেই মন পুলকিত হতে লাগলো l মাটির ঘরবাড়ি গুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় l
আমাদের প্রথম গন্তব্য খান্দারানী জলাধার l গ্রামের ভেতর দিয়ে এঁকে বেঁকে যেতে লাগলাম l ঘর বাড়ি গুলো মাটির l আর তাতে বিভিন্ন রঙ করা, নকশা করা l হাঁড়ি বাঁধা পায়রার জন্য l বিভিন্ন ফুল ফলের গাছ l মোরাম রাস্তা ধরে জঙ্গলের বুক চিরে স্কুটি নিয়ে ছুটে চলে থামলাম যেখানে সেখানে সম্মুকে বিশাল জলাধার l অবশ্য খুব বিশাল বললে ভূল বলা হবে l চারদিকে ছোট ছোট নাতিদীর্ঘ পাহাড় জলাধারে এসে মিশেছে l চারদিকে সবুজ গাছ পালা থেকে একটা সবুজে গন্ধ ছড়াচ্ছে l নাম না জানা বুনো ফুল চারদিকে আরো শোভা বর্ধন করছে l ছোট ছোট খেজুর গাছ ঝোপ সৃষ্টি করেছে l জলাধারের নাম খান্দারানী হলেও মোটেও তা খাঁদা বা খারাপ নয় l রানীর মতোই সে সুন্দর l স্বচ্ছ জল ঢল ঢল করছে l প্রখর রোদে চিকচিক করছে সেই জল l চরম নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে l পাশ দিয়ে সরু রাস্তা চলে গেছে l মনে হচ্ছে এই রাস্তা ধরে গেলেই দূরের দৃশ্যমান উঁচু পাহাড়টাতে পৌঁছানো যাবে l কিন্তু অতটা গুড় আধসের নয় l অনেক ঘুরে ঘুরে ওই উঁচু পাহাড়ে পৌঁছতে হবে বলে জানতে পারলাম পার্থ দার কাছে l কেউ কেউ স্নান করছে শীতল জলে l পাশেই জঙ্গল, সবুজ ঘাসের জমি l গরু বাছুর মন দিয়ে চরছে l রোদ টা বেশ চড়া l
তাই আর বেশিক্ষন থাকতে থাকতে পারলাম না l অবশ্য বেশি সময় কাটানোও চলবে না l ঘোরার জায়গা অনেক l তাই যেতে হবে অনেক পথ l পরের পর্বে সেই পথের গল্প করবো l সঙ্গে থাকুন l ধন্যবাদ l





















0 Comments