কালিকাপুর রাজবাড়ী, এক খন্ডহরের গল্প।

কালিকাপুর রাজবাড়ী, এক খন্ডহরের গল্প।
 
১৯৮৪ সালের ৮ই জুন রিলিজ করেছিল মৃণাল সেনের সিনেমা “খন্ডহর”।  মৃণাল সেনের অন্যতম সেরা কাজ। ছবিটির জন্য মৃণাল সেন ন্যাশানাল অ্যাওয়ার্ড পান সেরা ডাইরেক্টর হিসেবে আর শাবানা আজমি পেয়েছিলাম সেরা অভিনেত্রীর শিরোপা। একই সঙ্গে ছবিটির এডিটর মৃন্ময় চক্রবর্তী পান সেরা এডিটরের সম্মান। এছাড়াও  শিকাগো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা ফিল্ম হিসাবে গোল্ডেন হুগো আর মন্ট্রীয়ল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দ্বিতীয় সেরার পুরস্কার জিতে নেয় খন্ডহর।

 অনেকেই হয়ত সিনেমাটা দেখে থাকবেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রর ছোটোগল্প "তেলেনিপোতা আবিষ্কার” কে ভিত্তি করে তৈরী হয়েছিল সিনেমাটা। নক্ষত্রখচিত কাস্ট। মুখ্য চরিত্রগুলিতে অভিনয় করেছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, পঙ্কজ কাপুর আর অন্নু কাপুর। বাংলা ফিল্মের দুনিয়া থেকে ছিলেন শ্রীলা মজুমদার আর রাজেন তরফদার। শাবানা আজমির মায়ের ভূমিকার অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী গীতা সেন, যিনি ছিলেন মৃনাল সেনের স্ত্রী।

গল্প শুরু হয় তিন বন্ধুকে ঘিরে। এই তিন বন্ধুর শহর ছেড়ে এক গন্ডগ্রামে গিয়ে দিন তিনেকের ছুটি কাটানোর অভিজ্ঞতা ঘিরেই আবর্তিত হয় সিনেমার কাহিনী। এদের মধ্যে একজন সুভাষ (নাসিরুদ্দিন শাহ) পেশায় এবং নেশায় ফোটোগ্রাফার। বেড়াতে বেরিয়ে এক সন্ধ্যায় এদের মধ্যে একজন দীপুর (পঙ্কজ কাপুর) আত্মীয়ের গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছায় এই তিন বন্ধু। এর পরের আড়াইদিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই চিত্রনাট্যের জাল বোনা শুরু হয়।

যে বাড়িতে তিন আগন্তুক এসে পৌঁছায় সেটি কোন মামুলি বাড়ি নয়, বরং বলা যায় রাজপ্রাসাদ। তবে তার অতীত গৌরব বহু আগেই অন্তর্হিত। এখন সেটি ভগ্নপ্রাসাদ। বিশাল বিশাল থাম, দুর্গাদালান, নাট্মন্দির, অলিন্দ সব কিছু নিয়ে অতীত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে কোনোমতে শুধু টিঁকে আছে। বিশাল এই পোড়ো প্রাসাদের বাসিন্দা মাত্র দুটি মানুষ। অসুস্থ, শয্যাশায়ী এবং দৃষ্টিহীন এক মহিলা (গীতা সেন) আর তাঁর একমাত্র অবিবাহিত মেয়ে যামিনী (শাবানা আজমী)।




অন্ধকার জড় জীবনে বৃদ্ধা একটি মাত্র আশা নিয়ে বেঁচে আছেন, যে যামিনীকে পাত্রস্থ করবেন তাঁর এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় নিরঞ্জনের হাতে। চার বছর আগে নিরঞ্জন তাঁকে কথা দিয়ে গিয়েছিল যামিনীকে সে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। কিন্তু সে আর হয়নি, নিরঞ্জন কথা রাখেনি, আর কোন দিন ফিরেও আসেনি। বাস্তবে সে বিয়ে করে সংসারী ও শহরবাসী। কিন্তু সে খবর বৃদ্ধাকে জানানো হয়নি, আশার শেষ প্রদীপ্টুকুও  নিভে যাবে সেই আশঙ্কায়। যামিনী নিজেও জানে এই ঘটনা, কিন্তু মুখ বুজে শুধু মায়ের দেখভাল আর সেবা করে যায়।

মা মেয়ের এই নিস্তরঙ্গ জীবনে আবির্ভাব তিন বন্ধুর। কোন এক মূহূর্তে, ভাগ্যের পরিহাসে, দীপু আর তার বন্ধুদের উপস্থিতি মেয়ের চিন্তায় জর্জরিত দৃষ্টিহীন এই মহিলার মনে বিশ্বাস তৈরী করে যে নিরঞ্জনই আবার ফিরে এসেছে দীপুর সঙ্গে। সে এসেছে কথা রাখতে, যামিনীকে বিয়ে করে নিয়ে যেতে। বৃদ্ধার শারীরিক আর মানসিক অবস্থার কথা ভেবে তাঁর এই ভুল ভাঙ্গাতে যামিনী বা দীপু কেউই সাহস করে উঠতে পারে না। এক সময় আসে সেই মুহূর্ত যেখানে দীপু দেখা করতে আসে শয্যাশায়ী বৃদ্ধার ঘরে। তার সঙ্গে আসে সুভাষ। বৃদ্ধা ব্যাকুল হয়ে ওঠেন দীপুর সঙ্গে নিরঞ্জনও এসেছে ভেবে। বৃদ্ধার বারংবার প্রশ্নের উত্তরে তখনও ঘরের সবাই নিশ্চুপ। কারুর সাড়াশব্দ না পেয়ে অস্থির বৃদ্ধা অসহায়ভাবে ডাকতে থাকেন, হাত বাড়িয়ে নিরঞ্জনকে খুঁজতে থাকেন। ঘটনার আকস্মিক অভিঘাতে অনেকটাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে সুভাষ। কয়েক মুহূর্তের ইতঃস্ততা, তারপর এগিয়ে এসে বৃদ্ধার বাড়ানো হাত ধরে সে, নিরঞ্জন ভেবে পরম নিশ্চিন্তে বৃদ্ধাও আঁকড়ে ধরেন সুভাষের হাত। জিজ্ঞাসা করেন যামিনীকে সে বিয়ে করবে তো?  এক লহমায় সুভাষের সব কিছু ওলটপালট হয়ে যায়। সেই মুহূর্তে বৃদ্ধার ভুল ভাঙানোর মত মানসিক জোর সেও সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি। বৃদ্ধার হাত ধরা অবস্থাতেই সে হ্যাঁ বলে দেয়। তার পরেই পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন বৃদ্ধা।




এই ঘটনার পরে পরিচালক যামিনী আর সুভাষের মধ্যে এক সূক্ষ রসায়ন তৈরীর মুহূর্তগুলি দেখান, যার বেশিরভাগটাই অনুচ্চারিত। যামিনী একবার একান্তে সুভাষকে পায়, সে হয়ত কিছু বলতে চায় সুভাষকে কিন্তু ধন্যবাদ জানানো ছাড়া আর কিছু মুখ ফুটে বলে উঠতে পারে না। কিছু কথা অব্যক্তই রয়ে যায়। যামিনীর অসহায়তা সুভাষকে কিছুটা নাড়া দেয়, সুভাষও হয়ত কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু বাস্তবকে স্বীকার করে বলে উঠতে পারে নি। শুধু কিছু নিঃশব্দ কাঁটাছেঁড়া চলতে থাকে দুজনের মনে।

অবশেষে তিন বন্ধুর ফেরার দিন এসে যায়। গরুর গাড়িতে মালপত্র উঠে গেছে, বাস ধরার জন্য পৌঁছতে হভে সময়মত। ক্যামেরা ক্লোজ আপে ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা যামিনীকে ফোকাস করে। সুভাষের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যামিনীর মুখে যন্ত্রণার অনুভূতি খেলা করে যায়। এসময় সুভাষ হঠাৎ ফিরে আসে তার ক্যামেরা নিয়ে। তার শেষ শটে ধরা পড়ে ভাঙা দেওয়াল ধরে একলা দাঁড়িয়ে থাকা যামিনী।

সুভাষ ফেরে শহরে আর যামিনী আবার ফিরে আসে ভাঙা প্রাসাদে তার একঘেয়ে দিশাহীন জীবনচক্রে। যামিনী কি এই ধ্বংসস্তুপের জীবন থেকে মুক্তির স্বপ্ন ক্ষণিকের জন্য হলেও দেখেছিল? তাই কি সুভাষের চলে যাওয়ার মুহুর্তে শেষ আশাটুকুও, তা সে যতই অকিঞ্চিৎকর হোক না কেন, নিভে যাওয়ার যন্ত্রণায় বিদ্ধ হচ্ছিল সে? একি নিতান্তই বদ্ধ জীবন থেকে মুক্তির আহ্বান নাকি যামিনীর মনে সুভাষের জন্য কোন অনুভূতি জন্মেছিল?  সম্ভব নয় জেনেও সুভাষ কি একবারও ভেবেছিল যামিনীকে নিয়ে যাওয়ার কথা? মন্দির থেকে পুজো দিয়ে বেরোনর সময় যামিনীর প্রতি সুভাষের মুগ্ধ চাহনী আর ছবি তোলা, তা কি শুধুই এক ফোটোগ্রাফারের চোখে ধরা পড়া কিছু সুন্দর মুহূর্ত নাকি তার চেয়েও কিছু বেশী কিছু তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল? নাকি কিছুটা অনুকম্পা ছাড়া সুভাষের মনে আর কিছুই ছিল না যামিনীকে দেওয়ার জন্য? আবার সে রাতে যামিনীকে ঘিরে সুভাষের যে কয়েক মুহূর্তের স্বপ্নদৃশ্য পরিচালক দেখিয়েছেন তাও এক অন্যরকম ইঙ্গিত রেখে দেয় দর্শকদের জন্য। 




সব কিছুই থেকে যায় অনুচ্চারিত। শেষে সুভাষের স্টুডিওতে যামিনীর সাদাকালো পোর্ট্রেট ক্ষণিকের স্মৃতি হয়েই ঝুলতে থাকে।

রক্তমাংসের চরিত্ররা তো আছেনই, তাঁদের ছাপিয়েও পুরো সিনেমাটা জুড়েই এই প্রাচীন ভগ্নপ্রায় বিশাল প্রাসাদটা নিজেই এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছে। এই পৃথিবীর বুকে এই বাড়িটি যেন আলাদা একটা গ্রহ, সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, ধীরে ধীরে কিন্তু অবধারিত ভাবে এগিয়ে চলেছে ধ্বংসের দিকে, সঙ্গে এই গ্রহের বাসিন্দা দুটি মানুষকেও একই পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। খন্ডহরের বাসিন্দা যামিনী আর তার মায়ের জীবনের গল্প বাড়িটির মতই ভাঙাচোরা। হারিয়ে যাওয়া অতীত ছাড়া যেখানে কোন ভবিষ্যত নেই, আশার আলো নেই, শুধু বেঁচে আছে এক ক্ষইষ্ণু বর্তমান। বাড়ির প্রতিটি ঘরে, অলিন্দে, প্রকান্ড থামগুলোর আডালে, বারান্দায় ছাদে শুধু চাপচাপ অন্ধকার আর বিষাদ মাখামাখি হয়ে আছে। সূর্যের আলোও আর কোন নতুন বার্তা নিয়ে হাজির হয় না। আর সেই অন্ধকার যেন ছড়িয়ে গেছে যামিনীর জীবনে, তার মায়ের চোখে। নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন ভবিতব্য নেই। 

জানলে অবাক হবেন কোন একটিমাত্র বাড়ি নয়, চারচারটি বাড়ি মিলিয়ে শ্যুটিং হয়েছিল এই সিনেমার। অসাধারণ এডিটিং এর কাজে এত চারটি বাড়ি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে, দর্শক ধরতেই পারবেন না। এই চারটি বাড়ির ঠিকানা দিলাম।

১। কালিকাপুর রাজবাড়ী বর্ধ্মান
২। বাওয়ালী রাজবাড়ী 
৩। লর্ড সিনহার বাড়ি, রায়পুর বীরভূম
৪। বিজয় মঞ্জিল বা বর্ধ্মান হাউস, কলকাতা।

এই চারটি বাড়ির মধ্যে সিনেমার সিংহভাগ অংশ জুড়েই আছে কালিকাপুর রাজবাড়ী। কে কে মহাজনের ক্যামেরা ঘুরে বেড়িয়েছে এর প্রশস্ত কোর্ট ইয়ার্ডে, অলিন্দে,দুর্গামন্ডপে, নাট্মন্দিরের থামের আড়াল দিয়ে। সিনেমা শুরুর সাতাশ মিনিটের মাথায় যখন দেখানো হয় তিন বন্ধু গল্প করছে এক উঠোনে যেখানে থামের সারি সেটা এই কালিকাপুর রাজবাড়ির চত্বর। এই ব্যাপারে আসছি আবার পরে।



ইনডোর শ্যুটিং মানে যেখানে যেখানে ঘরের দৃশ্য দেখানো হয়েছে তার শ্যুটিং হয়েছে বজবজের কাছে বাওয়ালি রাজবাড়িতে। কালিকাপুর রাজবাড়ির অন্দরমহলের ঘর আর বিশেষ কিছুই অবশিষ্ট নেই, তাই ঘরের দৃশ্য যেখানে যামিনীর মা এক বিশাল ফোর পোস্টার বেডে শয্যাশায়ী সেটি আসলে বাওয়ালি রাজবাড়ীর একটি ঘর।  বর্তমানে এটি একটি মহার্ঘ্য হেরিটেজ হোমস্টে। 

এছাড়াও বাড়ির ছাদেও বেশ কিছু দৃশ্য শ্যুট করা হয়েছে। একজায়গায় দেখা যায় ছাদে আরামকেদারায় বসে রোদ পোহাতে পোহাতে তিন বন্ধুর কথপোকথন আবার আরেক জায়গায় শ্রীলা মজুমদার আর শাবানা আজমির একসঙ্গে শট যেখানে শ্রীলা মজুমদার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করছেন সুভাষের ব্যাপারে। এই শটগুলোতে ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যায় একটি পঞ্চ্ রত্ন বিশিষ্ট্ টেরাকোটার মন্দির। এটিও বাওয়ালি রাজবাড়ির দৃশ্য। ছাদ থেকে দেখা মন্দিরটি হল বাওয়ালি রাজপরিবারের কূলদেবতা রাধাকান্তের মন্দির।



বেশ কিছু শট নেওয়া হয়েছিল বাড়ির উঠোনের মধ্যেই এক কুয়োতলায়। কিছু জল তোলা ও বাসন ধোয়ার দৃশ্য আছে। এটাই হল বীরভূমে লর্ড সিনহার বাড়ি এবং এই বাড়ির চত্বরেই কুয়োতলাটি আছে। 

বর্ধ্মান হাউস সাজানো গোছানো বাড়ি। এখানকার রাজকীয় কাঠের সিঁড়িতে সুভাষের স্বপ্নদৃশ্যটি শ্যুট করা হয়েছিল। খুবই অল্প সময়ের জন্য দেখানো হয়েছিল যেখানে সুসজ্জিতা যামিনী সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে। 

এডিটরের কৃতিত্ব হল এই সবকটা বাড়িকে সুন্দরভাবে, ইংরেজীতে যাকে বলে seamlessly, সেভাবে মিলিয়ে দেওয়া যাতে দর্শকরা পুরোটা একটাই বাড়ি ভাবেন। চারটি বাড়ি মিলিয়ে শ্যুটং এর উদ্দেশ্য হয়ত ছিল বাড়ির ব্যাপ্তি (sense of vastness) দর্শকদের কাছে ফুটিয়ে তোলা। কোন একটি বাড়িতে হয়ত সবকটা দরকারী এলিমেন্ট পাওয়া যেতো না।

এবার আবার ফিরে আসি কালিকাপুর রাজবাড়ির গল্পে। এই বাড়িটিতে আমি বার তিনেক গেছি। আমার অত্যন্ত পছন্দের জায়গা। আমার মতে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে যত জমিদারবাড়ি ছড়িয়ে আছে তার মধ্যে এটির লোকেশন হল সবচেয়ে সুন্দর। চারিদিকে ঘিরে আছে ঘন শালের জঙ্গল আর তার বুক চিরে রাস্তা চলে গেছে কালিকাপুরের দিকে। বর্ধ্মান জেলা হলেও বীরভূমের সীমান্ত ঘেঁষা বলে লাল মাটির দাপট, রাস্তার ধারের জঙ্গলে যেন অনেকটা খোয়াইয়ের দৃশ্য। বেশ কিছুটা পিচ রাস্তায় চলার পর গাড়ি নামবে কাঁচা রাস্তায়, জঙ্গল আরো ঘন হয়ে আসবে। আর কিছুটা গিয়ে একটা বাঁক ঘুরলেই কালিকাপুর গ্রাম। প্রাইমারী ইস্কুল পেরোলেই সামনে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা, একটা পুকুর আর কালিকাপুর রাজবাড়ির অবয়ব দৃশ্যমান হবে।
  
এবার এই রাজবাড়ির ইতিহাস নিয়ে ছোট্ট করে বলি। 

অজয় নদের তীরে মৌক্ষীরা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন সদগোপ বংশীয় রায় পরিবার। এই পরিবারের কর্তা ছিলেন পরমানন্দ রায়। শোনা যায় তিনি ছিলেন বর্ধ্মান রাজ পরিবারের নায়েব এবং তার সুবাদে প্রভূত অর্থ উপার্জন করে জমিদারী পত্তন করেন। আদি নিবাস মৌক্ষীরাতে হলেও তিনি বসতবাটি স্থাপন করেন কাছের কালিকাপুর গ্রামে। শোনা যায় প্রতিবছর বর্ষায় অজয় নদের বানে প্লাবিত হত মৌক্ষীরা, সেজন্য পরমানন্দ রায় কিছুটা দূরে কালিকাপুর চলে আসেন। কালিকাপুরের প্রাসাদ তৈরী হয় ১৭৬১ শকাব্দে অর্থাৎ’ ইংরেজীর ১৮১৯ সনে। এটি আক্ষরিক অর্থেই সাতমহলা বাড়ি। পরমানন্দ রায় তাঁর সাত ছেলের জন্য সাতটি মহল তৈরী করেন। এর সঙ্গে যোগ হয় একটি রাজকীয় দূর্গাদালান আর সংলগ্ন নাট্মন্দির। এছাড়াও মূল প্রবেশদ্বারের ঠিক বাইরে বাঁদিকে তৈরী হয় একজোড়া শিবমন্দির। 

রাজবাড়ী চত্বরে ঢোকার মুখেই ডান দিকে পড়ে একটি বড় পুকুর। বাঁধানো ঘাটে এখনো কিছু কারুকার্য নজরে আসে। এর পরই দেখতে পাওয়া যাবে পাঁচিল ঘেরা রেখদেউল ঘরানার, লাল রঙের জোড়া শিব মন্দির। এখনও নিত্যপুজা হয় দুটি মন্দিরেই। দুটি মন্দিরের গায়েই সূক্ষ কাজের টেরাকোটার প্যানেলগুলি মুগ্ধ করবেই। 

প্রসঙ্গত বলে রাখি শুধু খন্ডহর নয়, আরো বেশ কিছু সিনেমার পটভূমি ছিল এই রাজবাড়ী। যদিও খন্ডহর সিনেমাতেই এই বাড়িটি সবচেয়ে ভালো ভাবে ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। 

এখানে যেযে সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে তার একটি তালিকা দিলাম। 

আর একটি প্রেমের গল্প – ২০১০
ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে – ২০১১
এলার চার অধ্যায় – ২০১২
মেঘনাদবধ রহস্য – ২০১৭
রসোগোল্লা - ২০১৮
গুপ্তধনের সন্ধানে – ২০১৮

গুপ্তধনের সন্ধানে সিনেমাটা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ইতিহাসবিদ সোনাদার রোমাঞ্চকর অভিযান। ইতিহাসের সঙ্গে থ্রিলারের পাঞ্চ, অনেকটা যেন বাঙালী প্রোফেসর ইন্ডিয়ানা জোনস। যাঁরা সিনেমাটা দেখেছেন তাঁরা এই মন্দিরদুটিকে দেখলে রিলেট করতে পারবেন। সিনেমায় এই মন্দিরের গর্ভগৃহের তলাতেই ছিল লুকোনো সুড়ঙ্গের মুখ যার নিচে গুপ্তধনের ভান্ডার। বাস্তবে অবশ্যই তেমন কিছু নেই। এই সিনেমার শুরুতে সোনাদা যখন গাড়ি নিয়ে জঙ্গলে পথে আসছে সেই শটগুলি এই রাজবাড়ী আসার পথেই নেওয়া। সিনেমার এই অংশটি দেখলে এলাকাটার সৌন্দর্যের একটা আন্দাজ পাবেন।



মন্দিরের পাশেই টানা লম্বা দোতলা জমিদারবাড়ি। মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলেই দেখবেন এখানের মূল আকর্ষণ সুবিশাল দূর্গাদালান। সামনে ছটি জোড়া পিলার Tuskan Order এ তৈরি। পিছনে ছটি খিলানযুক্ত মূল দুর্গামন্ডপ। মাঝখানের তিনটি আর্চড প্রবেশদ্বার। সদ্য সাদা রঙ করা হয়েছে। এটা শেষ বার গিয়ে দেখেছিলাম। এখনও প্রতিবছর এখানে দূর্গাপুজো হয়। ঠাকুরদালানের সামনেই বিশাল কোর্টইয়ার্ড সেখানে রয়েছে নাট্মন্দির। নাট্মন্দিরের ছাদ বহু আগেই ধসে পড়েছে। এখন শুধু থামগুলো দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে মুখ করে। এই নাট্মন্দির আর তার চারপাশের বারান্দাতে খন্ডহরের বেশ কিছু দৃশ্য শ্যুট হয়েছিল। সিনেমা শুরুর ২৭ মিনিটের মাথায় নাসিরুদ্দিন শাহ,পঙ্কজ কাপুর আর অন্নু কাপুরের ক্তহোপকথনের একটা লম্বা দৃশ্য এখানে তোলা হয়েছিল। অসম্ভব ভালো ভিস্যুয়াল, ক্যামেরা খুব সুন্দরভাবে গোটা জায়গাটাকে ধরেছিল। সিনেমার দৃশ্যে দেখা যায় কথাবার্তা বলতে বলতে ফোটোগ্রাফার সুভাষ (নাসিরুদ্দিন শাহ) এখানে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছিলেন।

চারপাশের ঘেরা দোতলা বাড়ির একতলার ছাদও ভেঙ্গে পড়েছে অনেক আগেই। উপরের গরাদহীন জানালা দিয়ে সূর্যের রশ্মি তেরছাভাবে টানা বারান্দায় এসে পড়ে এক অদ্ভুত আলো আধাঁরি পরিবেশ তৈরি করে।

দূর্গাদালান থেকে বার হয়ে পিছনদিকে গিয়ে বাড়ির অনান্য মহলগুলি ঘুরে দেখা যায়। সবই প্রায় ভগ্নদশা, আগাছা আর জঙ্গলে ভরে রয়েছে। কাছে যাওয়াই দুষ্কর। এর মধ্যে একটা ছোট অংশই এখন মোটামুটি বসবাসযোগ্য, যেখানে রায় পরিবারের একজন বংশধর বর্তমানে বসবাস করেন।  

এই বাড়ির পিছনদিকের মহলে একটা মজার জিনিস আছে। এখানেও একইরকম টানা দোতলা বাড়ি, নিচে জঙ্গল হয়ে আছে, কাছে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। দোতলায় সারি সারি জানলা। পাল্লা তো দুরের কথা, ফ্রেম শুদ্ধ অদৃশ্য হয়ে গেছে। ভিতরের সিলিংও ভেঙ্গে গেছে। ফাঁকা জানালার ফ্রেমগুলো দিয়ে পিছনের আকাশ দেখা যায়। একটু সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে যদি এখানে যান, আর আগে থেকে যদি আপনার ব্যাপারটা জানা না থাকে, তাহলে একটা দৃশ্য দেখলে চমকে উঠবেন। সব জানালাগুলি ফাঁকা, শুধু একটিমাত্র জানালার পাল্লাগুলি অক্ষত, অল্প যেন ফাঁক করা, আর সেই পাল্লার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে একটা মুখ। জনমানবশূন্য এই ভুতূড়ে বাড়িটিতে দিনের বেলাতেও আচমকা এমন একটা দৃশ্য দেখলে বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠা স্বাভাবিক। তবে একটু ধাতস্থ হয়ে খেয়াল করলে বুঝবেন ওই আস্ত জানালাটায় আসলে কোন কাঠের পাল্লা নেই। এটা হল নকল জানলা, পাল্লার ডিজাইনে চুনসুরকিতে গাঁথা, যাকে ইংরেজীতে বলে Faux Window. আর এই পাল্লার আড়ালথেকেই উঁকি মারা এক মহিলার মুখ একই সঙ্গে গাঁথা। এটিকে বলে ‘বাতায়নবর্তিনী’। নিচের ছবিটি দেখলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে। পশ্চিমবঙ্গের আরো কিছু জায়গায় এই বাতায়নবর্তিনীর কাজ দেখা যায়। খুব যদি ভূল না করি, বর্ধমানের শ্রীপুরের মন্দিরের গায়েও আমি বাতায়নবর্তিনী’ দেখেছি। এই কাজের পিছনে উদ্দেশ্য আন্দাজ করা কঠিন, তবে সেকালে বাড়ির পুরুষদের ফেরার অপেক্ষায় জানালায় দাঁড়িয়ে পথ চেয়ে থাকা নারীদের কথা ভেবে শ্লিল্পীরা হয়ত এটি বানাতেন।



কালিকাপুর রাজবাড়ী দেখা শেষ হলে সামনে যে রাস্তা মৌক্ষীরা গেছে সেই রাস্তা ধরে কিছুটা হাঁটলে ডানদিকে  রায় পরিবারের আর একটি  বাড়ির ধ্বংসস্তুপ নজরে আসবে। এর পিছনদিকে জঙ্গল ঘেরা একটি মনোরম দীঘি আছে। বাঁধানো ঘাট আজ অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে, তাও ঘাটের উপর করা কিছু জ্যামিতিক কাজ নজরে আসে। পিছনের বাড়িটি এককালে অপূর্ব সুন্দর ছিল বোঝা যায় কিন্তু কালের প্রভাবে আর অবহেলায় আজ এটিও ধ্বংসের মুখে। চারিদিক জঙ্গলে ঢাকা, সুতরাং বাড়ির অন্দরমহল এখন অগম্য তাই বাইরে থেকেই ছবি তুলে সন্তুষ্ট থাকতে হল। বাড়ির স্ট্রাকচার দেখে আন্দাজ করা যায় এটি হয়ত রায় পরিবারের আউট হাউস বা প্রমোদ্গৃহ ধরণের কিছু ছিল।

স্থানীয়দের থেকে জানলাম এখানে একটি বহু পুরোনো নীল্কুঠিও আছে। এই আউটহাউস থেকে কিছুটা এগিয়ে মূল পথ ছেড়ে ডানদিকে জঙ্গলের সুঁড়িপথ ধরে কিছুটা এগোলে নাকি সেটি দেখা যায়। বহু কষ্টে গলঘর্ম হয়ে জঙ্গল ভেঙ্গে তাকে আবিষ্কার করলাম বটে কিন্তু সম্পূর্ণ জঙ্গলে ঢাকা একটি ইঁটের পাঁজার মতো অবয়ব ছাড়া নীলকুঠির আর কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই। এমনকি ছবি তোমার মতও কিছু বেঁচে নেই। অবশেষে হাল ছেড়ে ফেরার রাস্তা ধরলাম।

পথনির্দেশঃ
পানাগড় থেকে যে রাস্তাটা সোজা গেছে ইলামবাজার সেই রাস্তায় বেশ কিছুতা গেলেই পড়বে ১১ মাইল । জায়গার নামে বোর্ড দেওয়া আছে, অসুবিধা হবে না। এখান থেকেই ডান দিকে রাস্তা কেটে গেছে জঙ্গল চিরে। এই রাস্তায় ড্রাইভ করাই একটা দারুণ অভিজ্ঞতা। কিছুটা গেলেই দেখবেন ডান দিকে একটা চওড়া মোরাম রাস্তা বেরিয়ে গেছে যেটা সোজা চলে গেছে আদুরিয়া বন বাংলো। জঙ্গলের মধ্যে এই সুন্দর বাংলোটির বুকিং দেন DFO Burdwan. তবে সে আবার অন্য গল্প। এবার এখান থেকে একটু এগোলেই একটা লাল মাটির মোরাম রাস্তা বাঁদিকে জঙ্গলে ঢুকে গেছে। গুগল ম্যাপে আগে থেকে কালিকাপুর রাজবাড়ী ডেস্টিনেশন সেট করে রাখুন নইলে মিস হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। এবার এই রাস্তায় কিছুটা গেলেই কালিকাপুর গ্রাম আসবে আর রাজবাড়ী দেখতে পাবেন সামনেই।

হাতে একদিন সময় থাকলে বা শান্তিনিকেতন যাওয়া আসার পথে একটা ছোট্ট Detour করে ঘুরে আসতে পারেন কালিকাপুর। ট্রেনে গেলে বোল্পুরে নেমে বাসে বা ভাড়ার গাড়িতে ইলামবাজার পেরিয়ে আসতে হবে এগারো মাইল। এই মোড় থেকে টোটো পাওয়া যায় কালিকাপুর আসার। গাড়ি সোজা চলে যাবে কালিকাপুর রাজবাড়ী। 

এছাড়াও ১১ মাইল থেকে মূল হাইওয়ের উল্টোদিকে জঙ্গলের পথে ঢুকে দেখে নিতে পারেন ইছাই ঘোষের দেউল। একদম অজয় নদের তীরে খুব সুন্দর পরিবেশে অনেকটা ওড়িশার রেখদেউল ঘরানার বহু প্রাচীন এই মন্দির। অজয়ের অপরপারেই জয়দেবের স্মৃতিধন্য কেঁদুলি। শীতকালে এই অজয়ের চরেই বসে কেঁদুলীর বিখ্যাত বাউল মেলা।

দেউল দেখা হলে দেখে নিতে পারেন কাছাকাছির মধ্যে শ্যামরূপার মন্দির আর মেধামুনির আশ্রম। এখানের পরিবেশ অবিকল তপোবনের মত।  

হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের স্বাদ নেওয়ার জন্য এই জায়গাগুলি অসাধারণ, শুধু সময় করে বেরোনোর অপেক্ষা।

Collected

Post a Comment

0 Comments