গভীর রাত। ঢং ঢং শব্দে ইংরেজ আমলের বড় ঘড়িটা জানান দিলো রাত দুটো। সব কয়েদিদের কুঠুরির বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাত পাহারায় থাকা সেপাইদের চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে বারবার। শুধু একটা কামরার আবাসিকদের চোখে ঘুম নেই। ওরা চারজন আজ সারাদিন কিছুই খেতে পারেনি। জল খেতে গেলেও গা গুলিয়ে উঠছে। শরীর অবসন্ন, চোখ জ্বালা করছে, তবুও ঘুম আসছে না। ওদের বিছানার পাশে রাখা রয়েছে চার সেট নতুন পোষাক। নতুন সাবান। তেল। চিরুনি। আর চারটে ভাগবত গীতা। কুঠুরির জানলা দিয়ে বাইরের ইলেকট্রিক বাতির ক্ষীণ আলো এসে বইগুলোর ওপর পড়েছে।
মুকেশ দুহাতে মুখ ঢেকে বসে বিড়বিড় করে কিসব যেন মন্ত্র আওড়াচ্ছে। অক্ষয় ঠাকুর এক নাগাড়ে কেঁদে চলেছে। বিনয় শর্মা মাঝে মাঝেই কেমন যেন খেই হারিয়ে ফেলছে। ওর হাত কাঁপছে অসম্ভব। গায়ে বেশ জ্বর। দেওয়ালে পিঠ দিয়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে বসে আছে পবন। দুচোখ কেঁদে কেঁদে লাল হয়ে গেছে। ঠোঁট কাঁপছে। যেন অস্ফুট শব্দে বারবার ক্ষমা চাইছে সে কারোর কাছে। হঠাৎ পাহাড়াদার চেঁচিয়ে উঠলো, "জাগতে রহো! জাগতে রহো!"
দু'হাত দিয়ে কান চেপে ধরলো পবন। ও কিচ্ছু শুনতে চায়না। ওর মন বলছে এটা একটা খারাপ স্বপ্ন। এক্ষুনি ওর ঘুম ভাঙবে আর দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে। সব আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ভয়ে কিছুতেই চোখ খুলছে না সে। হঠাৎই একটা চেনা গন্ধে ভরে গেলো ঘরটা। খুব চেনা গন্ধ। কিসের গন্ধ মনে করতে পারছেনা বিনয় শর্মা। চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই মনে আসছে না। অক্ষয়ের কান্না থেমে গেছে হঠাৎই। সে একটা শব্দ শুনতে পারছে। গন্ধটাও চিনতে পেরেছে সে। পেট্রোল পোড়া গন্ধ। আর শব্দটা একটা ইঞ্জিনের। বাসের ইঞ্জিন।
চারজনই ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গা ঘেঁষে উঠে দাঁড়ায়। আজ চারপাশ এত নিস্তব্ধ কেন। হঠাৎ ওদের মনে হয় ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা কমে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। মুকেশ একবার গরাদের লোহায় হাত দিয়েই ছিটকে সরে আসে। লোহা বরফের চেয়েও বেশি ঠান্ডা। একটা তীব্র হেডলাইটের আলো জ্বলে উঠলো আচমকা। কারাগারের ভেতরে বাস এলো কোথা থেকে, এটা ভাবার সাহস, শক্তি বা কৌতুহল কোনোটাই আর অবশিষ্ট নেই চারজনের দেহে। যেটা রয়ে গেছে, তা হলো আতঙ্ক আর দমবন্ধ করা অস্থিরতা। চারজনই অবাক হয়ে দেখলো 'ও'কে। 'ও'র নাম যেন কি কিছুতেই আজ আর মনে পড়ছে না। সেই রাতে ওরা সবাই মিলে যখন 'ও'কে...না তখনও জানা হয়নি 'ও'র পরিচয়। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে চারজনেরই ওর মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছে বারবার। পবন আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে। বিনয়ের মনে হচ্ছে ও অজ্ঞান হয়ে যাবে। 'ও' এসে দাঁড়িয়েছে গরাদের সামনে। কিন্তু এ কি 'ও'কে এত অস্পষ্ট লাগছে কেন। ওরা চারজনই আস্তে আস্তে পিছিয়ে যেতে থাকে। 'ও' যেন এগিয়ে আসছে খুব কাছে। এ দৃশ্যর চেয়ে মৃত্যু কম যন্ত্রনার। মুকেশ আবার দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলে।
গরাদের একদম কাছে এসে দাঁড়িয়েছে 'ও'! চুপ করে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে চারজনের দিকে। কিছুক্ষণ পর ফিসফিস করে চারজনের উদ্দেশ্যে 'ও' বললো;
নির্ভয় ভবঃ !!!
এক প্রচন্ড অট্টহাসি ছড়িয়ে পড়লো কারাগারের চারদিকে।
বুকফাটা আনন্দের অট্টহাসি!
Aniket Moitra

0 Comments