শিমুলতলায় লুটতরাজ

#শিমুলতলা-য় তখন খুব ডাকাতের উপদ্রব। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন বাড়িতে ডাকাত পড়ছে। সাঁওতাল পরগণার রুক্ষ, অনাবাদী, কৃপণ জমিতে উৎপন্ন সামান্য ফসলে খিদে মেটে না পাথর কুঁদে বানানো কালো শরীরগুলোর। কাজেই অপরের উদ্বৃত্ত সম্পদে নজর পড়ে। আর সে সব সম্পদই বা কম কী! নিভৃত অবকাশযাপনের জন্য কলকাতার বাবুদের তৈরী করা সুবৃহৎ অট্টালিকায় পিতল কাঁসার বাসনপত্র থেকে শুরু করে আবলুস কাঠের কারুকার্য করা খাট, আলমারি, চেয়ার, টেবিল...কি নেই! সোনা রুপোও ছিল কিছু কিছু। মজলিশে যেতে হত সে সব পরে। আবার বাড়িতে মজলিশ বসলে সম্ভ্রান্ত অতিথিদের জন্য বের করতে হত রুপোর বাসনপত্র! প্রশস্ত প্রাঙ্গণে সুবৃহৎ ইঁদারা, সিমেন্টের তৈরী জাকুজি, শতাধিক রকমের গোলাপের বাগান, বাইরের ভারী লোহার ফটকে লোহার তৈরী নিজস্ব চিহ্ন.... বৈভবের নিদর্শন সব জায়গাতেই। লর্ড সিনহা থেকে লেডি রাণু মুখার্জী, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ থেকে তৎকালীন দিনে কলকাতার সুবিখ্যাত মডার্ন ডেকরেটার্স.... কলকাতার প্রায় সব বিত্তশালী পরিবারেরই একটা করে অট্টালিকা ছিল শিমুলতলায়। পুজোর সময় থেকে শীতকাল, বছরে কিছুদিন করে গিয়ে জমজমাট আড্ডা বসত‌। বাকি দিনগুলোয় দারোয়ান, মালির কড়া পাহারায় দিন গুনতো ফাঁকা বাড়িগুলো।


ডাকাতের দলের নজর পড়তে দেরী হল না। বাইরে থেকে ঘোড়ায় চড়ে, বন্দুক কাঁধে আসা ডাকাত দলের সঙ্গে যোগ দিল স্থানীয় কিছু যুবকও। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন বাড়িতে চলতো লুটতরাজ। মালী, দারোয়ান পরিচিত স্থানীয়দের দেখে কিছু বলতে সাহস করতো না। সন্ধ্যার পর শিমুলতলা তখন আতঙ্কের। নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় শালবনের সড়সড় শব্দের মাঝে হঠাৎ শোনা যেত কাঁকুরে মাটিতে ঘোড়ার খুরের শব্দ। তারপর.....!



সময়টা হেমন্তের শেষ। অল্প অল্প হিম পড়ছে বিকেল বেলাতেই। এমন সময় কলকাতা থেকে সপরিবারে বাবুরা এলেন গাড়ি করে। পরিবারের ছোট ছেলের জন্মদিনটা শিমুলতলায় পালন করে কটা দিন ছুটি কাটাতে। ফোনের কোন সুবিধা ছিল না সেকালে। কাজেই আগে থেকে খবর দিয়ে আসার উপায় নেই। তড়িঘড়ি ঘর খুলে দিয়ে বুড়ো মালী দৌড়ালো হাটে। একটু সন্ধ্যে হলেই আর কিছু পাওয়া যাবে না। বড় রাস্তার আগে ভাঙা বাড়িটার রোয়াকে কয়েকজন স্থানীয় যুবক জড়ো হয়েছে। মুখে তাদের কাপড় জড়ানো। মনে মনে শিউরে উঠলেও মুখে কিছু না বলে চলে গেল বাজারের দিকে। খানিকক্ষণ পর ব্যাগভর্তি বাজার করে যখন ফেরার পথ ধরলো তখন অনেকক্ষণ হল সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। পথ জনশূন্য। অল্প অল্প শিরশিরে হাওয়া দিচ্ছে। শালবনের ফাঁক দিয়ে বাঁকা হয়ে চাঁদের আলো পড়ে পথের উপর আলপনা এঁকে দিয়েছে। কুটুরে পেঁচার ডাক শোনা যাচ্ছে থেকে থেকে। বাড়ির কাছে আসতেই চমকে উঠলো। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বাড়ি থেকে ভেসে আসছে মেয়েদের কান্নার আওয়াজ, আর প্রচুর হট্টগোল। মুহুর্তে বুঝে গেল কি হয়েছে! দ্রুত পায়ে লোহার ফটক ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেল চেনা মুখগুলোকে। বাড়ির ছোট্ট ছেলেটার মাথায় বন্দুক ধরে আছে একজন। অন্যরা দ্রুত হাতে সামনে যা পাচ্ছে লুঠ করছে! চেনা লোকগুলোকে দেখে অনেকটা অজান্তেই মালীর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, "হ্যাঁ রে, তোরা আমার বাড়িটাই পেলি?"



প্রমাদ গুনলো ডাকাত সর্দার। মালী যে তাদের চেনে এ কথা প্রকাশ হয়ে পড়লে বিপদ! পুলিশ ঠিক খবর পেয়ে যাবে। দ্রুত বন্দুকের নল ঘুরিয়ে ট্রিগার টিপলো। একটা চাপা আর্তনাদ করে লাল কাঁকুরে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়লো বুড়ো মালী। একবার কেঁপে উঠেই স্থির হয়ে গেল দেহটা। বাংলোর হাতার ইউক্যালিপটাস গাছের ফাঁক দিয়ে একফালি চাঁদের আলো যেন ওড়না টেনে দিল বুড়োর মুখে। রাত কাটতে অভিশপ্ত বাড়ি ছেড়ে ফিরে এল সকলে। তারপর থেকে আর কেউই প্রায় যেতে চাইতো না শিমুলতলায়। ডাকাতরা নির্বিচারে লুটতরাজ চালিয়ে লুটে নিল প্রায় সব সম্পদ। স্থানীয় কেয়ারটেকাররা কোনক্রমে টিকে থাকলো কিছু বাড়িতে। বেশিরভাগই বেদখল হয়ে গেল।
ডাকাতের আতঙ্ক কেটে গেছে অনেকদিন। কিন্তু পরিচর্যাহীন হয়ে দীর্ঘদিন পড়ে থেকে এখন শুধু অতিকায় অট্টালিকার কঙ্কালটুকু অবশিষ্ট। ফলে সেকালের ছবির মত বাংলোর অধিকাংশই এখন বসবাসের অযোগ‌্য। শুধু বৃহৎ ইঁদারা, অযত্নে আগাছা ভর্তি বাগানের শুকনো জাকুজি, লোহার ফটকে মরচে ধরা নিজস্ব চিহ্ন সাক্ষ্য দিচ্ছে অতীতের বৈভবের.....!

Post a Comment

0 Comments