মনে মনে
মন ভালো নেই। আজকাল আর মন ভালো থাকে না। বাবা জানলে এখুনি বলত, সৃষ্টিশীল কাজে ডুবে যা; মনটা ভালো হয়ে যাবে মুহূর্তে। কখনও একমনে আবৃত্তি, গল্পলেখার খাতায় দু-একটা আঁচড় কিম্বা আস্ত একটা দেওয়াল-পত্রিকা তৈরি ক'রে ফেলা - মনখারাপকে ঘায়েল করতে অস্ত্রগুলো খুব কাজে দিত বই কি! আর একদিন ব্রহ্মাস্ত্রের সন্ধান দিলো বাবাই - তোর যখন এত রান্নার শখ, যা নিজের ইচ্ছেমতো কিছু বানিয়ে ফেল। সবাই মিলে হইচই ক'রে খাওয়া যাবে খন।
খাদ্যরসিক, বাবা কোনোদিনই নয়। তবু ছেলেমেয়ের নিত্যনতুন রান্না চেখে দেখার জন্য বড্ড উত্সুক হ'ত। আমাদের রান্নার উপকরণগুলোর যোগানও দিত ঠিকঠিক। বরাবরই বাবা সকালে চায়ে চুমুক দিয়ে রেলবাজারে যেত রাজার মতো। মায়ের দেওয়া লিস্ট ধরে প্রচুর শাক-সবজি-মাছ কিনে কোনও কোনও দিন জুড়ে নিত নিজের পছন্দের ছোটো ছোটো পুঁটিমাছগুলোও। সহজসরল মানুষটা আগামী প্রলয়ঝড়কে সামলাতে বাজার থেকে ফিরেই কলতলায় বসে যেত ছোটোমাছ ধুতে-কাটতে। বিড়বিড় করতে করতে মা এসে দাঁড়াত পিছনে - মুরোদ তো জানা আছে! নাও নাও ওঠো। আমিই খেটে খেটে মরি আর কী! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলত বাবা।
এক ভারি বাজে স্বভাব ছিল বাবার। হ্যাঁ মানছি, খাওয়া নিয়ে তেমন কোনও বায়না ছিল না তার। শুক্তো থেকে চিকেন - সবই একরকম নিরুত্তাপভাবেই গলাধঃকরণ করত। একটা দিনের জন্যও মায়ের সামনাসামনি রান্নার প্রশংসা করেনি। আড়ালে হয়ত কখনও আমাদের বলেছে - মায়ের আজ কী হলো রে? রান্নাটা তো বেড়ে হয়েছে! তবে কোনও আড়াল রাখত না, রান্নায় নুন-ঝাল-মিষ্টির একটু এদিকওদিক হ'লে। মা রেগে যেত - তোমার মতো নেমকহারাম দু'টো দেখিনি। আজকাল মনে হয়, এ বাবার মস্তিষ্কপ্রসূত। মায়ের একটু রাগ-অভিমান, ছেলেমেয়ের হাল্কা শাসন - সবের ভেতরেই ভালোবাসার ছোঁয়া পেত বুঝি।
বাবা আমার ঋষিতুল্য। অন্তত খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে তো বটেই। দীর্ঘ কর্মজীবনে অফিসের টিফিনের জন্য নির্ধারিত ছিল - দু'টো আটার রুটি আর ছানা। পেটের গণ্ডগোলের ভয় পেত সবসময়। দিদার মুখেই শোনা, বিয়ের পরপরই মায়ের কাকার বাড়িতে মেয়েজামাইয়ের নিমন্ত্রণ। মা আগে থেকে এত সাবধান ক'রে দিয়েছিল ওনাদের, নতুন জামাইয়ের পাতে চারাপোনার ঝোল নির্দ্বিধায় দিতে পেরেছিলেন ওনারা। আর মায়ের পাতে শোভা পাচ্ছিল নাকি চিংড়ির মালাইকারি!
দিদি-আমি যখন বেশ ছোটো, মা অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী; বাবা বাধ্য হয়েই ঢুকত রান্নাঘরে। ভাতের মধ্যে যাবতীয় সবজি আর আলাদা ক'রে মুসুরডাল সেদ্ধ। খাবার পাতে নুন-কাঁচা তেল আর কাঁচালঙ্কার সহযোগ। আর কড়াইয়ের অনেকটা দূর থেকে ভয়ে ভয়ে ছুঁড়ত হলুদ-নুনমাখা রুই অথবা কাতলার পিসগুলো। কড়া মাছভাজার স্বাদই ছিল আলাদা।
বিধি আরও বাম হ'লে এদিনগুলোয় যমুনামাসির পায়ের ব্যথাটাও অসহ্য রকমের বেড়ে যেত। ফলে বাসনমাজা-ঘরঝাড়পোছার কাজে বাবাই এগিয়ে আসত অফিসের লেট উপস্থিতিকে স্বীকার ক'রেই। পাশের জেঠিমারা মুখ বেঁকাত - এসব কি পুরুষমানুষের কাজ? বাবা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলত - ঘরেবাইরের সব কাজ শিখে রাখবি কিন্তু। কে জানে কোনদিন কাজে লাগে!
কাজে লাগল দু'টো বছর আগে। সংসারের যাবতীয় খুঁটিনাটি কাজ সামলানোর পর্ব শুরু হ'লো। হঠাত্ ক'রেই ভীষণ একটা রোগ বাঁধাল বাবা। বাবার হাসপাতালে কাটানো দিনগুলো অভিশাপ হয়ে নেমে এলো আমাদের জীবনে। পড়ন্ত বিকেলের অস্তগামী সূর্যকে সাক্ষী রেখে যখন বাবার বেডের পাশে গল্প করতাম, চোখ জলে ভ'রে যেত। ধরা গলায় বাবা বলত - হাসপাতালের খাবার মুখে তোলা যায় না রে। খালি তোর ঠাকুমা-পিসিদের হাতের রান্নার কথা মনে পড়ে জানিস! কোথায় চলে গেল ওরা! ভয়ে বুক কেঁপে উঠত - ওরা স্বপ্নে ডাকে নাকি তোমায়?
দীর্ঘ পনেরোদিনের যুদ্ধ শেষে বাবাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনি। তখন অসুস্থতা শরীরের থেকেও মনে বাসা বেঁধেছে বেশি। সব খাবারই বিধিনিষেধের ঘেরাটোপে। সেই থেকে শান্ত মুখে নিয়মের একই খাবার খেয়ে চলেছে বাবা। আর অভিমান জমা করছে ডায়েরির পাতায়।
হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে বাবা যখন একটু শারীরিকভাবে সুস্থতার পথে, তখনই বাবার মন ভালোরাখার চেষ্টা শুরু করলাম আমরা। ছেলেবেলায় বাবার দেওয়া ওষুধই প্রয়োগ করলাম বাবার ওপর - সৃষ্টিশীল কাজে ডুবে থাকতে হবে তোমায়। হাতে তুলে দিলাম একটা ডায়েরি আর পেন। সময়ে-অসময়ে ওখানেই কাঁপা কাঁপা হাতে আঁকিবুকি কাটে বাবা। হঠাতই কাল চোখে পড়ল, সেখানে জ্বলজ্বল ক'রে ওঠা ক'টা কথা - কাবাব বড়ো ভালো বানায় ছেলে। এখন সব বারণ। তবুও খেতে ইচ্ছে হয় যে। হ্যাংলা হয়ে গেছি এখন।
মন সত্যি ভালো নেই, বাবা।
পুনশ্চ: দমে যাওয়ার পাত্র আমি নই। তাই চিকেন, ফিস কিম্বা পনির না হোক, বাবার প্রিয় আলু তো আছে। তা দিয়েই বানিয়ে ফেললাম পটেটো কাবাব। দু-তরফের মনই আজ ভালো হয়ে যাবেই যাবে।
Collected
0 Comments